কোথায় জেফারসনের শান্তির গণতন্ত্র?

গণতন্ত্র—শব্দটি যেন ম্যাজিকের মতো! যেন গণতন্ত্রের ম্যাজিকে সকল সমস্যা এক ফুৎকারে মিলাইয়া যাইবে! কিন্তু আমরা কি জানি, গণতন্ত্র আসলে কী? কাহাকে বলে গণতন্ত্র? অনেকে আবার সরাসরি গণতন্ত্র শব্দটি উচ্চারণ করেন না। কেহ বলেন ‘শোষিতের গণতন্ত্র' কিংবা ‘মৌলিক গণতন্ত্র'। তৃতীয় বিশ্বের অনেক সাধারণ নাগরিক গণতন্ত্র বলিতে শুধু 'ভোট' দেওয়াটাকেই বুঝিয়া থাকেন। আবার সেই 'ভোট' দেওয়াটাও এই সকল জনপদে নানানভাবে ম্যান্যুপুলেট করা হয়। এইভাবে 'গণতন্ত্র'-এর মধ্যে বিশ্বের বহু দেশেই এক ধরনের ছদ্মবেশ ঢুকিয়া পড়ে। অথচ বর্তমানে গণতন্ত্রকে বলা হইয়া থাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা। ইহা তখনই শ্রেষ্ঠ, যখন ইহার মধ্যে কোনো ছদ্মবেশ থাকে না। এই গণতন্ত্রের সূচনা ও জনপ্রিয়তা তো বিশ্বে খুব সহজে হয় নাই।

ব্রিটানিকায় দেওয়া তথ্যমতে, প্রাচীন গ্রিকের অ্যাথেন্স শহরে প্রথম গণতন্ত্রের দৃষ্টান্ত দেখা যায়—যেইখানে প্রায় হাজার নাগরিকের একটি অ্যাসেম্বলির মাধ্যমে সকল সিদ্ধান্ত নেওয়া হইত। পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দিককার অঙ্গরাজ্যগুলিও এই ধরনের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের রচয়িতা টমাস জেফারসনের 'অন ডেমোক্রেসি' বইটি হুইতে জানা যায় : ১৭৮৯ সালে জেফারসন লিথিয়াছিলেন, 'কতগুলি অধিকার রহিয়াছে, যাহা সরকারের নিকট সমর্পণ করা নিষ্প্রয়োজন, অথচ ঠিক সেইগুলিরই ওপর হস্তক্ষেপ করিতে সকল দেশে সকল ধরনের সরকারকে সর্বদা ব্যস্ত থাকিতে দেখা গিয়াছে। এই অধিকারগুলি হইতেছে—চিন্তার অধিকার, ভাবপ্রকাশের অধিকার, অবাধ বাণিজ্যের অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার।'

বিস্ময়কর ব্যাপার হইল, জেফারসন যখন ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তখন ফরাসিরা তাহাদের সম্রাটের মস্তকছেদ করিতেছে। জেফারসন যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট, তখন নেপোলিয়ন যুদ্ধের পর যুদ্ধ জয় করিয়া ইউরোপের একচ্ছত্র নায়ক হইবার পথ প্রস্তুত করিতেছেন। জেফারসন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তখন নেপোলিয়নের স্থলবাহিনী দেশের পর দেশ পদদলিত করিতেছে এবং ইংরেজদের নৌবাহিনী সমুদ্রে ধ্বংসের কাজ চালাইতেছ। দীর্ঘ ২০ বৎসরেরও অধিক সরকারি পদে থাকাকালীন জেফারসন দেখিয়াছেন—পৃথিবীতে কোথাও শান্তি নাই। এজন্য তিনি চাহিয়াছিলেন— গণতন্ত্র কায়েম হউক সারা বিশ্বে। ইহার পূর্বে ১৬৮৯ সালে, ইংল্যান্ডের রাজা-রানি উভয়েই অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করিলেন, যাহা পরিচিত হইল—'বিল অব রাইটস' নামে। এই দলিল কয়েকটি সাংবিধানিক নীতিকে স্বীকৃতি দিল, যাহার মধ্যে ছিল নিয়মিত সংসদ বসানোর অধিকার, সুষ্ঠু নির্বাচনের অধিকার, এবং সংসদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার। ক্রমশ প্রজাতন্ত্র তথা গণতন্ত্রের পথে হাঁটিল ইংল্যান্ড। ইহার পর সুইজারল্যান্ড এবং অনেক মার্কিন অঙ্গরাজ্য ১৯ শতকে তাহাদের সংবিধানে গণতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত করিল।

এই ভারতীয় উপমহাদেশে 'ব্রিটিশ ভারতে' ১৯১৯ সালে ভারত শাসন আইন রচিত হয়— যেইখানে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার কথা প্রথম বলা হয়। অতঃপর ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে ১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক আইন পরিষদ গঠনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইহার পর ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হইল। ১৯৫০ সালে ভারত নিজেকে প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে, যাহার মূল কথা হইল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। অন্যদিকে পাকিস্তানে গণতন্ত্র এবং ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র বারংবার হোঁচট খাইয়াছে।

গণতন্ত্রে ভোট ও সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ বটে। তবে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন, জনগণকে নিয়ন্ত্রণ, মতপ্রকাশের ভয়, শাসকের ক্ষমতা হারাইবার ভয়, লুটেরা গোষ্ঠীর সৃষ্টির মাধ্যমে গণতন্ত্র রোগাক্রান্ত হয়। এই রোগাক্রান্ত গণতন্ত্রের যদি নিরাময় সম্ভব না হয়, তাহা হইলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নৈরাজ্য বারংবার আঘাত হানিবে। প্রশ্ন জাগে—কাহাদের জন্য জেফারসনের শান্তির গণতন্ত্রের পথে বারংবার কাঁটা বিছানো হইতেছে? একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমন এক সমাজ— যেইখানে নির্ভয়ে মানুষ প্রশ্ন করিতে পারে, অকপটে ভিন্নমত প্রকাশ করিতে পারে, এবং নিজেদের মৌলিক অধিকার অর্জন করিতে পারে। এই বিষয়াদির চর্চা এবং এই সকল আত্মজিজ্ঞাসাই গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য।
প্রশ্ন হইল–এই সৌন্দর্য কি তৃতীয় বিশ্ব কখনো ধারণ করিতে পারিবে? না-পারিলে উহাকে কেন গণতন্ত্র বলা হইবে?