প্রায় ২ কোটি লোকের বসবাস ঢাকা নগরীতে। জনসংখ্যার বিচারে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম শহর। পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি কিংবা উন্নত জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর অসংখ্য গ্রামীণ পরিবার ঢাকায় আসে। আর এই অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যার কারণেই তৈরি হয় ঢাকার পরিবেশ বিপর্যয়—নষ্ট হয় মাটি, দূষিত হয় বায়ু, পানি কিংবা উচ্চশব্দে শ্রবণশক্তি কমে শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের। পরিবেশ বিপর্যয় শুধু প্রকৃতির জন্য নয়, মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনমানের জন্যও এক মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে।
ঢাকা ছিল একসময়ে নির্মল বাতাসের শহর। কুয়াশা আচ্ছন্ন সকাল, পাখির কিচিরমিচির। গত কয়েক দশকে দ্রুত নগরায়ন, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প-কারখানার নির্গমন এবং বর্জ্য পোড়ানোর মতো কর্মকাণ্ড এই শহরকে বায়ুদূষণের এক বিষাক্ত আবর্তে ফেলে দিয়েছে। ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় শীর্ষে থাকে বিশেষ করে শীতকালে। শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ এবং এমনকি ক্যানসারের মতো ভয়াবহ ব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে দূষিত বাতাস। শিল্প কারখানা, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজ, ইটভাটা এবং উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো—এগুলোই প্রধানত এই দূষণের জন্য দায়ী।
পানিদূষণের দিক দিয়েও ঢাকার প্রথম কাতারেই অবস্থান। ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী যেন শুধুই আবর্জনা ফেলার স্থান! শিল্প- বর্জ্য, গৃহস্থালির বর্জ্য ও হাসপাতালের বিষাক্ত কেমিক্যালের কারণে পানি মারাত্মকভাবে বিষাক্ত। তুরাগ-শীতলক্ষ্যার পানিও ভালো নেই। এতে জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটছে এবং নদীগুলো মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে জলস্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।
ঢাকার মাটিদূষণ ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্তিক, ধাতব ও রাসায়নিক বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে ট্যানারিশিল্প, রং কারখানা ও ধাতু গলানোর কারখানার বর্জ্যে ভারী ধাতু যেমন সীসা, ক্রোমিয়াম ও পারদ মাটিতে জমে জমিকে অনুর্বর করে তুলছে। এছাড়া প্লাস্টিক ও পলিথিনের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটির গুণগত মান নষ্ট করছে, ফলে জৈব উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। প্রান্তিক, পলিথিন দীর্ঘদিন মাটিতে টিকে থাকায় ঢাকার মাটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
শব্দদূষণ ঢাকার আরেকটি উপেক্ষিত কিন্তু ভয়াবহ সমস্যা। যানবাহনের লাগাতার হর্ন বাজানো, নির্মাণকাজের শব্দ এবং লাউডস্পিকারের অতিরিক্ত ব্যবহার ঢাকাকে বিশ্বের অন্যতম শব্দদূষিত শহরে পরিণত করেছে। দিনের বেলা যেখানে সর্বোচ্চ অনুমোদিত শব্দমাত্রা ৬৫ ডেসিবেল, সেখানে ঢাকায় অনেক সময় ৯০ থেকে ১২০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছায়। এর প্রভাব হিসেবে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, মানসিক চাপ, ঘুমের ব্যাঘাত এবং শিশুদের শিক্ষায় মনোযোগের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। পানিদূষণ মোকাবিলায় প্রয়োজন সব কারখানায় কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার চালু করাসহ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, নদী পুনরুদ্ধার এবং ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন। বায়ুদূষণ কমাতে পরিবেশবান্ধব ইটভাটা ব্যবহার, পুরনো যানবাহন নিষিদ্ধ, নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করা দরকার। মাটিকে রক্ষা করতে হলে বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন, প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা, জৈব সার ব্যবহারের প্রচলন এবং শহর এলাকায় সবুজায়ন কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। শব্দদূষণ থেকে মুক্তি পেতে ‘নো হর্ন জোন' নির্ধারণ, লাউডস্পিকার ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
ঢাকা আমাদের শহর, আমাদের প্রাণের শহর। এর মুক্ত বাতাস ফিরিয়ে আনা কোনো অসম্ভব কাজ নয়। যদি আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করি—সরকার, বিভিন্ন সংস্থা এবং সাধারণ জনগণ—তবেই হয়তো ঢাকা তার হারানো মুক্ত আবহাওয়া ফিরে পাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ এবং সুন্দর ঢাকা রেখে যাওয়া আমাদেরই দয়িত্ব। শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা