রংপুরের তারাগঞ্জে মেয়ের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করতে গিয়ে মবের হাতে গণপিটুনিতে নিহত রূপলাল দাসের (৪০) মেয়ে নূপুরের আজ বিয়ে।
শোক আর আনন্দের মিশেলে বিয়ের আয়োজন চলছে রূপলালের বাড়িতে। শনিবার (১ নভেম্বর) বিয়ের আগের দিন গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান হলেও উৎসবের বদলে ঘরজুড়ে বিষাদের ছায়া।
বিয়ের প্যান্ডেল, গেট, আত্মীয়-স্বজনদের আপ্যায়নের প্রস্তুতি সবই রয়েছে; কিন্তু নেই বাবার মুখে আশীর্বাদের হাসি। যে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করতে গিয়েই রূপলাল প্রাণ হারিয়েছিলেন, সেই মেয়েই আজ বিয়ের পিঁড়িতে বসছেন।
নূপুরের পরিবার জানায়, রূপলাল ছিলেন তারাগঞ্জ বাজারের এক চর্মকার (জুতা মেরামতকারী)। চুরির অপবাদে গত ১০ আগস্ট স্থানীয় জনতা তাকে ও তার আত্মীয় প্রদীপ দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে। এরপর থেকেই নূপুরদের পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।
নিহত রূপলালের মেয়ে নূপুর রবিদাস বলেন, আমার বিয়ের আয়োজন হলেও মনের ভেতরে বাবা হারানোর কষ্টের স্রোত বইছে মনের মাঝে। বাবার হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে অথচ পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেনা। আমি তারাগঞ্জ সরকারি কলেজে ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত। ছোট বোন রুপা স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে। ছোট ভাই জয় রবিদাস তারাগঞ্জ ওয়াকফ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির ছাত্র। আমি এখন পরের ঘরে চলে যাচ্ছি কী হবে আমাদের পরিবারের? এই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বাবার হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারসহ তাদের বিচার হলে মনে কিছুটা শান্তি পেতাম।
রূপলালের ছেলে জয় রবিদাস বলেন, বাবা নেই বোনের বিয়ের পুরো কাজটা আমাকেই করতে হচ্ছে। অনেক টাকা-পয়সার দরকার। হাট থেকে তিনটা খাসি কিনেছি। জামাই বাবুকে উপহার দেওয়ার জন্য ঘরসজ্জার সরঞ্জাম কিনেছি। এ ছাড়া স্বর্ণের আংটি, চেইন ও চুড়ি দিতে হয়েছে। আমার মামা আমাদের অভিভাবক হিসেবে দেখাশোনা করছেন।
রূপলালের স্ত্রী ভারতী রবিদাস বলেন, আমার ভাতিজি জামাই প্রদীপ রবিদাস ছিলেন পরিবারের অভিভাবকতুল্য একজন মানুষ। নূপুরের বিয়ের দিন-ক্ষণ ঠিক করার জন্যই ডাকা হয়েছিল। কিন্তু আমার স্বামী ও জামাইকে পিটিয়ে হত্যা করেছে কিছু মানুষ। আমি ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে দিশাহারা। মেয়ে নূপুরের বিয়েতে অনেক টাকা লাগছে। ধার-দেনা করে বিয়ে পার করতে হচ্ছে।
তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুবেল রানা জানান, নুপুরের বিয়ের জন্য উপজেলা পরিষদের তহবিল থেকে এক লাখ টাকা এবং সমাজসেবা কার্যালয় থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও নুপুরের পড়াশোনার জন্য শিক্ষা ভাতা, ভারতী রবিদাসের জন্য বিধবাভাতা এবং জয়লালের ব্যবসার জন্য দোকান ঘরের বরাদ্দ করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, রুপলালের মৃত্যুর পর প্রশাসন, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন ব্যক্তি পরিবারের খোঁজ-খবর রাখার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু আশ্বাসের মাস না পেরুতেই আর কেউ খোঁজ রাখেনি এই অসহায় পরিবারের।
রংপুরের মানবাধিকার কর্মী অ্যাড. জোবাইদুল ইসলাম বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন রুপলাল। তিনি মবের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করায় রাষ্ট্রকে তার পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে।যেহেতু মেয়ের বিয়ে দিন-তারিখ ঠিক করার আগে রুপলালকে হত্যা করা হয়েছে। তাই তার মেয়ের বিয়ে যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় এবং প্রশাসন, প্রতিবেশী, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি ও সহযোগিতায় বাবার শুন্যতা যেন নুপুর অনুভব করতে না পারে সেই ব্যবস্থা করা উচিত।
প্রসঙ্গত, গত ১০ আগস্ট তারাগঞ্জের সয়ার ইউনিয়নের বুড়িরহাট বটতলায় চুরির সন্দেহে স্থানীয়রা রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাসকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর দুজনেই মারা যান। রূপলালের স্ত্রী ভারতী রানী বাদী হয়ে ৫০০–৭০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ এ পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে।