জয়পুরহাট-১ (জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি উপজেলা), ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির একটি শক্তিশালী ঘাঁটি, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে মোঃ মাসুদ রানা প্রধানকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে একধরনের স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বগুড়া জেলা যেটাকে বিএনপির ঘাঁটি বলা হয়ে থাকে তাঁর আশেপাশে কয়েকটি জেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য জয়পুরহাট জেলা। স্বৈরাচার শাসনের সময়ে ‘রাতের ভোট’ ও ডামি নির্বাচন বাদ দিলে এই জেলার দুটি আসনেই বিএনপির শক্ত দখল রয়েছে। আর গত সোমবার মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকে সেটি জানান দিয়েছে বিএনপি। পাশের জেলা বগুড়া ৬ ও বগুড়া ৭ আসনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মনোনয়ন প্রার্থী হয়েছেন।
বিএনপির স্থানীয় ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভাষ্য, সেই হিসেবে জয়পুরহাট ও নওগাঁও মত জেলাগুলোতে বিএনপির শক্ত প্রার্থী না দাড়ালে নির্বাচনে জয়ের সুযোগ হাতছাড়া হয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জয়পুরহাট-১ আসনে মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীকে জামায়াত নেতারা খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে না। স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের মতে, এই মনোনয়ন জামায়াতকে একটি অপ্রত্যাশিত সুবিধা এনে দিতে পারে যেখানে জয়পুরহাট-১ আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে বিএনপির তৃণমূল থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক দুর্বলতা জামায়াতকে স্থানীয়ভাবে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করার সুযোগ করে দিয়েছে। জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিশ্বাস, আসন্ন নির্বাচনে তারা এর পূর্ণ সুবিধা ঘরে তুলবেন। স্থানীয় বিএনপি কর্মীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীর মধ্যে জামায়াতের শক্তিশালী প্রচার ও ডিজিটাল প্রচারণা মোকাবিলা করার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সক্ষমতার অভাব রয়েছে। তাদের মতে, দলে ফয়সল আলিমের মতো অনেক ত্যাগী ও নিষ্ঠাবান প্রার্থী রয়েছেন, যাদের ক্লিন ইমেজ এবং জনসম্পৃক্ততা এই আসনে বিএনপির বিজয় সুনিশ্চিত করতে পারত। এই ধরনের শক্তিশালী প্রার্থীর অভাব জামায়াতকে মাঠ দখলে নিতে সাহায্য করবে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, জামায়াত বিএনপির প্রার্থীদের দুর্বল দিকগুলো স্থানীয় মানুষদের সামনে তুলে ধরছে। বিশেষ করে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, আওয়ামী লীগ কর্মীদের পুনর্বাসনে হস্তক্ষেপ, আত্মীয়প্রীতি এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের অভিযোগ ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, নারী ও তরুণ ভোটাররা এমন বিতর্কিত প্রার্থী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতারা। বিএনপির দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়িত কর্মীরা মনে করছেন, যদি এই দুর্বলতার সঙ্গে জামায়াতের সংগঠিত প্রচারণা যুক্ত হয়, ভোটের ফলাফলে বিপরীত প্রভাব পড়তে পারে। এদের মতে, একজন ক্লিন ইমেজধারী এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী থাকলে এই আসনে বিএনপির ফল আরও ভালো হতে পারত।
সবমিলিয়ে বলা চলে, জয়পুরহাট-১ আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন জামায়াতকে উজ্জীবিত করলেও, এই সিদ্ধান্ত দলের জন্য একটি বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। কীভাবে বিএনপি এই আসনটি জামায়াতের সম্ভাব্য বিজয় থেকে রক্ষা করতে পারে, তাই এখন স্থানীয় রাজনীতিতে মূল আলোচনার বিষয়।
উল্লেখ্য, ১৯৮৪ সালে গঠিত এই জয়পুরহাট ১ আসনটি বিএনপির শক্ত অবস্থানের প্রতীক। ১৯৮৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১০টি সাধারণ নির্বাচনের মধ্যে বিএনপি এই আসনে চারবার জয়ী হয়েছে। এমনকি ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও বিএনপি এই আসন থেকে বিজয়ী হয়। যদিও ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে এবং ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোটে’ ও ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনে বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে; গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে আসনটি শূন্য। এবারে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ফয়সল আলিম এবং জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ রানা প্রধান এই আসনে দলটির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। ফয়সল আলিম প্রয়াত আব্দুল আলিমের সন্তান, যিনি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে টানা দুইবার এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং বিএনপি সরকারে মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপি থেকে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন প্রাপ্ত প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে উজ্জীবনা সৃষ্টি করেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আরও শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হলে আসনে বিজয় সহজে পাওয়া যেত।