অন্তর্গত শান্তির খোঁজে যোগচর্চা: দ্য ফ্লো ফেস্ট ঢাকা ২০২৫

ঢাকার মতো দ্রুতগামী ও চাপপূর্ণ নগরে যোগের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করার ফলে শরীর হয়ে পড়ছে অনমনীয়; মেরুদণ্ডে টান, ঘাড়ে ব্যথা ও ক্লান্তি বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও নিদ্রাহীনতা নিঃশেষ করে দিচ্ছে কর্মশক্তি। এই বাস্তবতায় যোগব্যায়াম হতে পারে এক প্রশান্ত আশ্রয়— যেখানে শরীর সচল হয়, শ্বাস শান্ত হয়, আর মন খুঁজে পায় কোমল ভারসাম্য।

রাজধানীর গুলশান-২ এ বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ পার্কে আয়োজিত ‘দ্য ফ্লো ফেস্ট ঢাকা ২০২৫’-এ যোগচর্চার জন্য থাকছে বিশেষ আয়োজন। এবারের দ্য ফ্লো ফেস্ট ঢাকা ২০২৫ অনুষ্ঠিত হবে ৬ থেকে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত। 

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, উৎসবে উপস্থিত থাকবেন ১১ জন অভিজ্ঞ যোগ প্রশিক্ষক— কেরি, শ্যাজি ওম, ঈমান, আনাম, নাইলা, দ্যুতি, ফারিয়া, তাস, নামিত, ইউশা ও যোগানিকা।

তাদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব যোগধারা ও দর্শন। কেউ শরীরের শক্তি ও নমনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন, কেউ শ্বাস-প্রশ্বাস ও ধ্যানের সমন্বয় শেখান, কেউ বা আত্ম-সহানুভূতি ও অন্তর্গত শান্তির পথে আহ্বান জানান।

এই উৎসবে অংশ নিয়ে দর্শনার্থীরা হাথা যোগ, বিন্যাসা, অষ্টাঙ্গ, রেস্টোরেটিভ ও ধ্যানভিত্তিক যোগের মতো ভিন্নধর্মী শৈলীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। অংশ নিতে রেজিস্ট্রেশন করা যাবে: www.theflowfest.com/dhaka

যোগ মানে কেবল শরীরচর্চা নয়
অনেকে মনে করেন যোগ মানে শুধুই শারীরিক ব্যায়াম, কিন্তু এর মূল দর্শন আরও গভীর। সংস্কৃত শব্দ ‘যুজ’ থেকে ‘যোগ’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ সংযোগ বা মিলন। যোগের লক্ষ্য হলো দেহ, মন ও আত্মার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা। যোগ শেখায় নিজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে— শরীরের প্রতিক্রিয়া শোনা, শ্বাসের ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করা, এবং মনকে বর্তমান মুহূর্তে স্থির রাখা। যখন প্রতিদিনের যোগাভ্যাসে শরীর ও মনের মধ্যে সংলাপ গড়ে ওঠে, তখন জীবনের ছোট-বড় প্রতিটি ঘটনার প্রতিও সচেতনতা বাড়ে।

অহিংসা যোগের মূল দর্শন
‘দ্য ফ্লো ফেস্ট ঢাকা ২০২৫’-এ যোগচর্চার পাশাপাশি দর্শনার্থীরা অনুশীলন করতে পারবেন অহিংসা নীতি— অর্থাৎ শারীরিক, মানসিক ও আবেগগত স্তরে অ-সহিংসতা ও করুণার জীবনচর্চা। অহিংসা কেবল কারও ক্ষতি না করা নয়; বরং নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। যোগ শেখায় শরীরকে জোর করে নয়, ভালোবাসা দিয়ে চালনা করতে।

নিজের প্রতি এই কোমলতা ধীরে ধীরে অন্যদের প্রতিও সহমর্মিতা গড়ে তোলে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই শহুরে জীবনে যোগকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে— যেখানে প্রতিযোগিতা, চাপ ও মানসিক ক্লান্তি নিত্যসঙ্গী, সেখানে অহিংসার চর্চা আমাদের করে তোলে ধৈর্যশীল ও সহানুভূতিশীল।

যোগের মানসিক প্রভাব
যোগ শুধুমাত্র পেশি বা হাড়ের ব্যায়াম নয়— এটি মন ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত যোগাভ্যাস শরীরে কর্টিসল নামের চাপ-হরমোন কমায় এবং সেরোটোনিন বাড়ায়, যা মন ভালো রাখে। শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন (প্রাণায়াম) মনকে শান্ত করে, ঘুমের মান উন্নত করে ও মনোযোগ বৃদ্ধি করে। ধ্যানচর্চা নেতিবাচক চিন্তা ও আবেগকে মৃদু করে, ফলে ব্যক্তি হয়ে ওঠে আরও সহনশীল ও সংবেদনশীল।

যোগ ও সমাজ
তরুণ, কর্মজীবী কিংবা গৃহিণী সবাই যোগব্যায়াম থেকে উপকার পেতে পারেন। দীর্ঘ সময় বসে কাজের ফলে যে পেশিজনিত সমস্যা তৈরি হয়, যোগ তা কমায়। উদ্বেগ বা মানসিক চাপ মোকাবিলায় ধ্যান ও প্রাণায়াম কার্যকর প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।ঢাকায় এখন পার্ক, ছাদ কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যোগচর্চার কেন্দ্র গড়ে উঠছে। এসব উদ্যোগ কেবল শরীরচর্চাই নয়, বরং মানুষে মানুষে সংযোগ তৈরিরও সুযোগ করে দিচ্ছে। একসঙ্গে যোগচর্চা মানে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা যেখানে প্রত্যেকে অন্যের শক্তি ও প্রেরণা হয়ে ওঠে।