তামাকমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্য অর্জনের পথে সৌদি আরব

সৌদি আরব একটি দূরদর্শী জনস্বাস্থ্য উদ্যোগের মাধ্যমে তামাক আসক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুনভাবে তাদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে, যা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ)-এর সহায়তায় গঠিত দেশীয় প্রতিষ্ঠান ‘বাদায়েল’ এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছে, যার লক্ষ্য এক মিলিয়ন ধূমপায়ীকে ধূমপান ছাড়তে সহায়তা করা। প্রতিষ্ঠানটি এখন এই লক্ষ্য নির্ধারিত সময়ের ছয় বছর আগেই পূরণ করবে বলে প্রত্যাশা করছে।

২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বাদায়েল’ অল্প সময়ের মধ্যেই সৌদি আরবে এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের উদ্ভাবনী পণ্য ‘ডিজার্ট’ যা দেশীয়ভাবে তৈরি তামাকমুক্ত নিকোটিন পাউচ। যেটি ধূমপায়ীদের সিগারেট থেকে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে দূরে সরে যেতে সহায়তা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। মাত্র দুই বছরেরও কম সময়ে প্রায় ৪ লাখ ধূমপায়ী তামাক থেকে সরে এসেছে এবং তাদের মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি সম্পূর্ণভাবে নিকোটিন ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এত অল্প সময়ে এ ধরনের সাফল্য সত্যিই নজিরবিহীন।

এই সাফল্যের মূল কারণ হলো সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর অধীনে জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর না করে, দেশটি এখন ‘ক্ষতি হ্রাস’ বা হার্ম রিডাকশন মডেল গ্রহণ করেছে, যেখানে নিষেধের বদলে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নিরাপদ বিকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই পরিবর্তন দেশের ‘কোয়ালিটি অব লাইফ প্রোগ্রাম’-এর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, সহজলভ্য আধুনিক স্বাস্থ্য সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতাকে গুরুত্ব দেয়।

ডিজার্ট নামের নিকোটিন পাউচ আসলে একদম নতুনভাবে ধূমপান ছাড়ার সুযোগ দিচ্ছে। এটা একেবারে ধোঁয়ামুক্ত, তামাকমুক্ত এবং এতে কোনো আগুন বা দহন লাগে না, তাই সিগারেটের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থও নেই। ফলে ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকিও অনেক কমে যায়। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের গবেষণায় দেখা গেছে, যদি নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এমন নিকোটিন পাউচ সিগারেটের তুলনায় অনেক নিরাপদ। এটা ধূমপায়ীদের জন্য ধীরে ধীরে ধূমপান ছাড়ার সহজ ও কার্যকর উপায় হতে পারে।

এরই মধ্যে দেশজুড়ে এই উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে ধূমপানজনিত রোগের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে, আর মানুষ ধোঁয়ামুক্ত বিকল্পগুলোকেও ক্রমে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে। এই পরিবর্তন শুধু অভ্যাসের নয়, এটি একধরনের মানসিকতা ও সংস্কৃতিগত অগ্রগতি যা বিজ্ঞানভিত্তিক সংস্কারের প্রতি সৌদি জনগণের উন্মুক্ত মনোভাব এবং দেশের সামগ্রিক আধুনিকায়নের পথে যাত্রার প্রতিফলন।

জনসচেতনতা ও জনগণের সম্পৃক্ততাও এই উদ্যোগের বড় একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। চলতি বছরের শুরুতে বাদায়েল তাদের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করে দেশব্যাপী ‘লেটস ক্লিয়ার দ্যা এয়ার’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে, যেখানে নাগরিক, প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলোকে ধূমপান কমানোর অভিযানে অংশ নিতে উৎসাহিত করা হয়। এই প্রচারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা সবার যৌথ দায়িত্ব।

যেসব দেশে এখনো তামাক ব্যবহারের প্রবণতা বেশি, যেমন বাংলাদেশ, তাদের বাস্তবতার সঙ্গে সৌদি আরবের অগ্রগতির পার্থক্য সত্যিই স্পষ্ট। বাংলাদেশে এখনো প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৩৫ শতাংশেরও বেশি কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করেন, যার ফলে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ তামাকজনিত কারণে মারা যায়। কর বৃদ্ধি ও জনসচেতনতা প্রচারণা থাকা সত্ত্বেও, তামাক ব্যবহার এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে সমাজে। সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা দেখায়—যখন উদ্ভাবন, সঠিক নীতি ও জনসচেতনতা একসঙ্গে কাজ করে, তখন সবচেয়ে মারত্মক অভ্যাসও বদলানো সম্ভব।

কৌশলগত বিনিয়োগ আর আসক্তি মোকাবিলায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি মিলিয়ে সৌদি আরব এখন পুরো অঞ্চলের জন্য এক নতুন উদাহরণ তৈরি করছে। বাদাইল দেখিয়েছে, যদি সঠিক নীতি, আধুনিক প্রযুক্তি আর মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ একসাথে কাজ করে, তাহলে তামাকবিরোধী আন্দোলনকে সত্যিই শক্তভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়। এই উদ্যোগ এখন মধ্যপ্রাচ্যে তামাক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে সফল ও আশাব্যঞ্জক উদাহরণগুলোর একটি।

লেখক: আইনজীবী ঢাকা জজ কোর্ট এবং মহাসচিব, সোসাইটি ফর হিউম্যান রাইটস, ঢাকা, বাংলাদেশ