আজ ছিটমহল বিনিময়ের মাত্র চার বছর। খুব বেশি সময় নয়। বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর এরই মধ্যে যেন ঘুচে গেছে দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনা। ঘোর অন্ধকারের বুকে জেগেছে আলোর বন্যা। ছিটমহল বিনিময়ের চার বছরের মাথায় ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো, প্রশস্ত পাকা রাস্তা, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, সরকারি উদ্যোগে নির্মিত সুদৃশ্য মসজিদ-মন্দির, বিটিসিএল অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল সেন্টার, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা—এ যেন আলাদিনের চেরাগের স্পর্শে বদলে গেছে এক নতুন জনপদ দাসিয়ারছড়া।
আজ ৩১ জুলাই ছিটমহল বিনিময়ের চার বছর পূর্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দারা। এর মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাত ১২টা ১ মিনিটে ৬৮টি মোমবাতি প্রজ্বালন, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, প্রতিটি বাড়িতে আলোকসজ্জাসহ খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ১৮টি মসজিদে মিলাদ মাহফিল ও তিনটি মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, গত চার বছরে প্রায় ২২ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়নকাজ হয়েছে দাসিয়ারছড়ায়। এর মধ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন এবং ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডির মাধ্যমে ২৪ কিলোমিটার পাকা রাস্তা তৈরি হয়েছে দাসিয়ারছড়ায়। ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে কালীর হাটে কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টার, ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি মসজিদ, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মন্দির, ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ব্রিজ, ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে হতদরিদ্র পরিবারের ১০টি বসতবাড়ি নির্মাণ উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে ভূমি জটিলতার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নিরসন হয়ে গেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ১ হাজার ৬৪৩ একর ও সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত ৯ একর জমির প্রাক্জরিপ শেষ করে খতিয়ান হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকল্পে স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃক তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে। দাসিয়ারছড়াসহ বিলুপ্ত ছিটমহলে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তির ৭৫ দিনের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৫৬২টি পরিবারে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এখন আর কোনো বাড়িই নেই বিদ্যুিবহীন। দেওয়া হয়েছে দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সরকারের সর্বোচ্চ মহল এখানকার সুবিধা-অসুবিধার খোঁজ নিচ্ছেন। ডিজিটাল সাব সেন্টার থেকে স্বল্পমূল্যে দেওয়া হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির সেবা। ইউনিসেফের অর্থায়নে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি স্থাপন করেছে ১৫টি প্রাক্প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র। এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে ১৪টি মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কেন্দ্র। উপজেলা কৃষি অফিসের অর্থায়নে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কৃষি যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে। দাসিয়ারছড়ায় ঘরে ঘরে সুপেয় পানি আর স্যানিটেশন-ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বেকার যুব ও যুব মহিলাদের দেওয়া হয়েছে নানা ট্রেডে প্রশিক্ষণ।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আশামণি, জেসমিন আক্তার ও তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সাথী আক্তার, মেঘলা, রোজিনা আক্তার জানায়, ‘নিজ জন্মভূমিতে পড়ালেখা করছি। আমাদের ভাইবোনরা মিথ্যা ঠিকানা দিয়ে পড়ালেখা করেছে। আমরা এখন বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে পড়ালেখা করছি। সরকার বই ও উপবৃত্তি দিয়েছে। আমরা হাসিমুখে পড়ালেখা চালিয়ে যাব।’
দাসিয়ারছড়া সমন্বয়পাড়া নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর ইসলাম ও কামালপুর মইনুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, ‘এত দিন মিথ্যা ঠিকানা দিয়ে পড়ালেখা করে নিজের টাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছি। নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছি, কিন্তু বেতন-ভাতার খবর নেই।’ একই কথা বলেন, দাসিয়ারছড়া বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক জাকিরসহ কয়েকজন শিক্ষক। তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের দ্রুত বেতন-ভাতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
দাসিয়ারছড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী মোহেছেনা আক্তার মিনা জানান, চার বছর ধরে বিলুপ্ত ছিটমহলে গড়ে প্রতিদিন গর্ভবতী মাসহ ৩৫ থেকে ৪০ জন রোগী স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছেন। চিকিত্সাসেবা পাওয়ায় দাসিয়ারছড়াবাসী খুবই খুশি।
আরো পড়ুন : চট্টগ্রামে তরল দুধ নিয়ে বিপাকে খামারিরা
দাসিয়ারছড়ার সাবেক পঞ্চায়েতপ্রধান নজরুল ইসলাম, মোজাফফর আলী, বেলাল মিয়াসহ অনেকেই জানান, এখন তারা বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয় দিতে পেরে আনন্দিত ও গর্বিত। তারা বলেন, ‘বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে চার বছর ধরে আমাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি স্কুল-কলেজে পড়ালেখা করছে। কেউ কেউ চাকরিও করছে। কৃষি অফিসার আসছেন। প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। বিভিন্ন জাতের ধান ও সবজি চাষ করে আমাদের দাসিয়ারছাড়ায় অনেকেই এখন সফল কৃষক। সরকার আমাদের বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা দিচ্ছে। অনেক আনন্দ আমাদের।’
সাবেক ছিটমহল আন্দোলনের নেতা গোলাম মোস্তফা মইনুল হক বলেন, ‘আমাদের প্রাণের দাবি দাসিয়ারছড়া ইউনিয়ন ঘোষণা না হলেও গত চার বছরে সরকার ব্যাপক হারে যেভাবে উন্নয়ন করেছে, তাতেই আমরা সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা. মাছুমা অরেফিন বলেন, বিলুপ্ত ছিটমহলের অবরুদ্ধ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার বদ্ধপরিকর। এছাড়া গত চার বছরে বিলুপ্ত ছিটমহলে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।
ইত্তেফাক/ইউবি