ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: নীলফামারীর চিত্র

নীলফামারীর চার আসনেই প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সরব হয়ে উঠেছে নীলফামারীর রাজনীতি। জেলার চারটি আসনেই এখন স্পষ্টভাবে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। হাটবাজার, চায়ের দোকান, গ্রামের মোড় কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠান—সব জায়গায়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ভোট ও প্রার্থীরা।

নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীরা নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন উঠান বৈঠক, পথসভা ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে। ভোটারদের কাছে তুলে ধরছেন নিজেদের অবস্থান, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে সরব প্রচারণা। পোস্টার, ব্যানার ও শুভেচ্ছা বার্তায় মুখর হয়ে উঠেছে গোটা নীলফামারীর জনপদ।

স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন পর এমন একটি নির্বাচন আসছে, যেখানে মানুষ কিছুটা স্বস্তিতে ভোট নিয়ে ভাবতে পারছে। নীলফামারী জেলার চারটি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের গতিবিধি এরই মধ্যে স্পষ্ট। জেলার চারটি নির্বাচনী আসন বরাবরই পতিত আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

 

নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা)

ডোমার-ডিমলা দুই উপজেলার ২০ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত সংসদীয় এ আসনটি। এটি সংসদীয় আসন ১২। এই আসনে বিএনপি কৌশলগত কারণে এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত করেনি। জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন জেলা আমির অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার। এখানে ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য প্রার্থী (ডোমার-ডিমলা) মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল জলিল।  এছাড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থীরাও রয়েছেন সক্রিয় প্রস্তুতিতে। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট এম হাছিবুল ইসলাম ও এনসিপির জেলা কমিটির যুগ্ম-সদস্যসচিব রাশেদুজ্জামান রাশেদ।

নীলফামারী-২ (সদর উপজেলা)

এ আসনটিকে জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। একটি পৌরসভা এবং ১৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নীলফামারী-২ আসন।  বিএনপি জেলা কমিটির সদস্যসচিব এ এইচ এম সাইফুল্লাহ রুবেলকে প্রার্থী ঘোষণায় দলীয় সমর্থনে গোটা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনসমূহ এককাট্টা হয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। জেলা আইনজীবী সমিতির সেক্রেটারি ও জামায়াতের অ্যাডভোকেট আলফারুক আব্দুল লতীফ, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট এম হাছিবুল ইসলাম।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মনোনয়ন পেয়েছেন নীলফামারী নাগরিক হাসপাতালের কর্ণধার ডা. কামরুল ইসলাম। গণঅধিকার পরিষদ নীলফামারী জেলা কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমও নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানায়। অন্যদিকে সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রবীণ রাজনীতিবিদ জয়নাল আবেদীনও নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।

তবে, স্থানীয় নির্বাচন বোদ্ধাদের মতে, বিগত নির্বাচনগুলোর মতো এবারো জোটসঙ্গী বিএনপি-জামায়াতের আসন ভাগাভাগির নির্বাচন হলে, এ আসনের মনোনয়ন থেকে বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর যে কোনো এক জন ছিটকে পড়বেন, এটা প্রায় নিশ্চিত। এ আসনে হিন্দু ভোটার ফ্যাক্টর বলে সূত্র জানিয়েছে। প্রায় ৫৪ হাজার অমুসলিম ভোটের মোটা দাগে আওয়ামী পালে ভিড়লেও এবার জয়-পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক হিসেবে দেখা দিতে পারে।

নীলফামারী-৩ (জলঢাকা)

নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার ১১ ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত নীলফামারী-৩ আসন।  জামায়াত অধ্যুষিত এই আসনে দলটির প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন অধ্যক্ষ ওবায়দুল্লাহ সালাফী। তিনি জামায়াতে ইসলামী রংপুর মহানগর সেক্রেটারি। বিএনপির পক্ষে এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি।

নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির হয়ে মাঠে রয়েছেন সৈয়দ আলী ও ফাহমিদ ফয়সাল চৌধুরী (কমেট)। ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে আছেন মুহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার। তবে নীলফামারী-৩ (জলঢাকা) আসনে এনসিপি দলটির কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম প্রকাশ পায়নি।

নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ)

দুই উপজেলা ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ১৫ নম্বর আসনটি নীলফামারী-৪ আসন। এখানে জামায়াতের একক প্রার্থী হাফেজ মাওলানা আব্দুল মুনতাকিম। বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা শাখার সভাপতি আলহাজ অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকার। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে সমর্থকরা বিক্ষোভ করে প্রার্থী বদলে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রিয়াদ আরফান সরকার রানাকে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এবি পার্টির মনোনীত প্রার্থী মো. মোকতাদা আল ছদর। প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন এনসিপির উত্তরাঞ্চনীয় যুগ্ম-মুখ্য সংগঠক আবু সাঈদ লিওন। ইসলামী আন্দোলনের মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাবেক এমপি আলহাজ সিদ্দিকুল আলম। এ আসনে বিহারি (অবাঙালি) ভোটার বড় ফ্যাক্টর বলে জানা গেছে। এ আসনে ৮০ হাজারের বেশি বিহারি ভোটার রয়েছে।

নির্বাচনী আবহের মধ্যে জেলার এক হাটে কথা হয় কৃষক মতিয়ার রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ভোট দিতে পারব কি না, এটা আগে চিন্তার বিষয় ছিল। এবার একটু আশাবাদী। ঠিকমতো ভোট দিতে পারলে ভালো প্রার্থীকেই ভোট দেব।’

তরুণ ভোটার মেহেরুন নেছা বলেন, ‘এটাই আমার প্রথম ভোট। আগে শুধু শুনতাম ভোট কারচুপি হয়, এবার নিজের ভোট নিজেই দিতে চাই।’ একই কথা বলেন শিক্ষক মতিউর রহমান। তার ভাষ্য, ‘মানুষ এখন দল নয়, ব্যক্তিকে দেখে। কে এলাকার জন্য কাজ করেছেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’

এ বিষয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কেন্দ্র চিহ্নিতকরণ ও মাঠ পর্যায়ে সমন্বয়ের কাজ চলছে পুরোদমে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জেলায় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে। এতে করে চারটি আসনেই ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে দলীয় অনেক প্রার্থী বিদ্রোহী অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি রেখেছেন।