বিশ্ববিদ্যালয়ই সমৃদ্ধ জাতির বাতিঘর

বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আমরা বুঝে থাকি বিযেখানে বিশ্ববিদ্যার চর্চা করা হয়। 'If University is not universal, it is not a university'। সভ্যতার ইতিহাস, প্রগতির ইতিহাস, মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার ইতিহাস আসলে বিশ্ববিদ্যালয়েরই ইতিহাস। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়কে এখনো আমরা ভাবি নিছক গতানুগতিক তাত্ত্বিক চর্চার ক্ষেত্র, যা শ্রমবাজারের চাহিদা থেকে অনেকটাই দূরে। একদিকে সমাজ চায় সৃজনশীল, নৈতিক ও অভিযোজনে সক্ষম নাগরিক; অন্যদিকে শিল্প ও শ্রমবাজার চায় এমন স্নাতক, যে প্রথম দিন থেকেই নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারে। এই দুই প্রত্যাশার মধ্যখানে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন দিশাহীন। দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার আদর্শ ও স্বল্পমেয়াদি কর্মদক্ষতা তৈরির চাপ-এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতাই উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে ফেলেছে প্রশ্নের মুখে।

বাংলাদেশ বর্তমানে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে রূপান্তরিত হয়েছে শিল্প এবং সেবাচালিত অর্থনীতিতে। অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে প্রযুক্তি। ফলে উৎপাদন আর সেবার প্রকারেও পরিবর্তন হচ্ছে। উন্নত এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশে অত্যন্ত দক্ষ জনবল রয়েছে, যারা এ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলো বুঝতে এবং উৎপাদন ও সেবা ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে সক্ষম। তবে বাংলাদেশে যেমন উচ্চ দক্ষতা, উদ্ভাবনী ও গভীরতর চিন্তাভাবনা এবং সমস্যা সমাধান করার দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরি হয়নি, তেমনি মানবসম্পদ তৈরি হয়নি বলে অনেক ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য হয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হচ্ছে এবং তাদের বেতন-ভাতাদি বাবদ প্রতি বছর ৫ বিলিয়নের বেশি ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অদ্যাবধি তেমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে পারেনি। একই সময়ে ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে সহযোগী উদ্ভাবনমূলক গবেষণা মূলত অনুপস্থিত থাকায় বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিযোগিতামূলক র‍্যাংকিংয়ে অবনত হচ্ছে। কাজেই উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর সমাধান করা জরুরি প্রয়োজন। বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত মোট ৩৫ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছে। অথচ এসব বিষয় নিয়ে ইন্ডিয়ায় ৪০ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৪৪ শতাংশ এবং সিংগাপুরে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করে।

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মূলত সনাতন শিক্ষাদান পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকি। শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠদানে শিক্ষার্থীরা কোর্সের উপকরণগুলো সত্যিকারভাবে শিখছে কি না এবং অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগে দক্ষতা অর্জন করছে কি না, সে বিষয়ে মনোযোগ না দিয়ে শুধু তাদের কোর্সের উপকরণ সম্পর্কিত জ্ঞান দ্বারা মূল্যায়ন করা হয়। এখানে শিক্ষার্থীরা নিষ্ক্রিয় লার্নার। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ফলাফল ভালো করার কৌশল রপ্ত করে এবং মুখস্থ ও আবৃত্তি কৌশলগুলো শিখতে অনুপ্রাণিত হয়। শেখার মূল্যায়ন পরিচালিত হয় মূলত লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে। প্রশ্নের সঠিক উত্তর না দেওয়ার কারণগুলো পর্যালোচনা করা হয় না এবং কোর্স শিক্ষক গ্রেড প্রদানের মাধ্যমে ছাত্রের মূল্যায়ন করে থাকেন। এ পদ্ধতিতে কর্মজীবনে তারা চিন্তা করার, সমস্যা সমাধান এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য হতে হবে একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং ভালো আর্থ-সংবেদনশীল দক্ষতার সংমিশ্রণে শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ ব্যবস্থা সৃষ্টি করা। এটি সম্ভব হলে শিক্ষার্থীরা কাজের জগতের জন্য এবং গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর আরো বিস্তৃত সামাজিক এবং নাগরিক জীবনের জন্য প্রস্তুত হবে।

বর্তমানে বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা (OBE) এবং ছাত্রকেন্দ্রিক শেখার (SCL) মডেলগুলো শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রবর্তন করেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষাদান পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা এবং শেখার আধুনিকীকরণ করা দরকার। অন্যদিকে পাঠ্যক্রম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক বিকশিত হয়েছে এবং আরো গতিশীল প্রকৃতির হয়ে উঠেছে। পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়েছে সামগ্রিকভাবে শিক্ষানবিশদের এবং সমাজের চাহিদা পূরণের জন্য। সনাতন পাঠ্যক্রম শিক্ষককেন্দ্রিক এবং এটি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন জীবন-সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করার জন্য প্রস্তুত করে না। সনাতন পাঠ্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বিষয়কেন্দ্রিক। এ পাঠ্যক্রমটি সংরক্ষিত প্রকৃত জ্ঞানের একটি অঙ্গ, যা শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠানো হয় এবং মুখস্থ, আবৃত্তি ও ড্রিলের মাধ্যমে তারা তা আয়ত্ত করে। আর অন্যদিকে আধুনিক পাঠ্যক্রম বিষয় এবং জীবনকেন্দ্রিক উভয় সংমিশ্রণে প্রস্তুত হয়। শিক্ষক শিক্ষাক্রম বিকাশ, বাস্তবায়ন ও সংশোধন করতে মূল ভূমিকা পালন করেন।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্যের পথে চলার জন্য এ প্রমাণভিত্তিক পাঠ্যক্রমটি একটি রোড ম্যাপ হিসেবে কাজ করে। কোনো কোর্সে ছাত্রদের অগ্রগতি মূল্যায়ন পদ্ধতিগুলোও এখন ভিন্ন। বর্তমানে চার ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি রয়েছে-ডায়াগনস্টিক, ফরম্যাটিভ, বেঞ্চমার্ক (অন্তর্বর্তীকালীন) এবং সামেটিভ। এসব মূল্যায়ন পদ্ধতির উদ্দেশ্য আলাদা, তবে একত্রভাবে এসব পদ্ধতি শিক্ষার্থীর একাডেমিক মূল্যায়নে কাজ করে। কাজেই এ শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ মডেলগুলো আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং শিক্ষার্থীর একাডেমিক কর্মক্ষমতা মূল্যায়নের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষকদের অবশ্যই জানা এবং জেনে তা প্রয়োগ করা দরকার।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃদ্ধি উচ্চশিক্ষায় সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষের সন্তানদের সুযোগকে প্রসারিত করেছে এবং সরকারি তহবিলের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার জন্য সরকারের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করছে। নিয়োগকর্তাদের প্রত্যাশা থাকে, স্নাতকেরা যেন নির্দিষ্ট সফটওয়‍্যার চালনা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের সব প্রক্রিয়ায় অবিলম্বে অবদান রাখতে পারে। এই বাস্তবতার চাপে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন দক্ষতামূলক কোর্স চালু করছে। এসব উদ্যোগ প্রাসঙ্গিক, তবে প্রায়ই দেখা যায় এগুলো হয়ে উঠছে কোনোমতে কাজ চালানোর কেরামতি, যা শিক্ষার রূপান্তরমূলক ভূমিকাকে ক্ষুণ্ণ করছে। কর্মদক্ষতা নিয়ে একটি বড় ভ্রান্তি হলো, অনেকেই মনে করেন পাঠ্যক্রমে কয়েকটি 'ট্রান্সফারেবল স্কিল' যোগ করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা এর চেয়ে জটিল। একজন শিক্ষার্থীর চাকরি পাওয়া এবং কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা কেবল তার প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপরই নির্ভর করে না, করে তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজির ওপরও।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে মূলত গত দুই দশকে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতি বছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে। নতুন সব বিভাগ, প্রোগ্রাম ও গবেষণার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রসার নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নানা সংকট। যেগুলোর অন্যতম হলো দক্ষ একাডেমিকের ঘাটতি এবং এই সংকট ক্রমাগত প্রকট হয়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত গবেষণা, উদ্ভাবন, জ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তোলার দায়িত্ব। কিন্তু পর্যাপ্ত যোগ্য একাডেমিক না থাকলে এসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, বায়োটেকনোলজি, রোবোটিকস কিংবা ডেটা সায়েন্স-এসব ক্ষেত্র বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষা তার নতুন দিগন্তরেখা তৈরি করছে। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব ক্ষেত্রে আধুনিক ল্যাবরেটরি, গবেষণা খাতে অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশিক্ষিত প্রফেসর নিয়োগ করে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে নতুন প্রোগ্রাম শুরু হলেও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিনিয়র একাডেমিক সংকট করুণ এক বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিতসংখ্যক শিক্ষক থাকলেও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা ও অভিজ্ঞতার অভাব থেকে যাচ্ছে। এতে করে শিক্ষার্থীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি গবেষণা কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিদ্যমান শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে, তাদেরকে একই সঙ্গে ক্লাস নেওয়া, গবেষণা পরিচালনা, থিসিস তত্ত্বাবধান এবং প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হচ্ছে। ফলে অনেকে গবেষণায় মনোনিবেশ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। একটি ফলপ্রসূ সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস্টারিং এবং একাডেমিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি নেটওয়ার্ক সিকিউরিটি অথবা যে কোনো একটি বিষয়ের একজন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর থাকেন, তাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় পাঠদানের আমন্ত্রণ করতে পারে। একইভাবে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অন্য কোনো বিষয়ের একজন দক্ষ প্রফেসর থাকেন, তাহলে তিনিও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াতে পারেন। শিক্ষার মান নিশ্চিত করা আসলে জটিল ব্যাপার, এর সঙ্গে অনেক বিষয় সম্পৃক্ত। শিক্ষা-দর্শনে একটি মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। শিক্ষাকে 'পণ্য' এবং শিক্ষার্থীকে 'ভোক্তা' হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিতে হবে। শিক্ষাকে দেখতে হবে একটি যৌথ সামাজিক বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব হিসেবে। যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিল্প ও সমাজ মিলিতভাবে ভবিষ্যতের নাগরিক গড়ে তোলে। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কোনো উচ্চমার্গীয় বিমূর্ত ধারণা নয়। বিশ্বপরিমণ্ডলে দৃশ্যমান কাঠামোয় বিরাজমান বাস্তবতায় জ্ঞানের যে পুঞ্জীভূত নিদর্শন জমা হয়ে আছে, তারই সরল বহিঃপ্রকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যমে ফুটে ওঠে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ক্রমে জ্ঞানার্জনের পথে হাঁটতে হয়।

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও গবেষক