ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

শরীয়তপুরে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে প্রার্থীরা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে শরীয়তপুরের তিনটি আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। আসন তিনটিতে বিএনপি, জামায়াতসহ আরো কয়েকটি দল তাদের প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। 

২০২৪-এর রাজনৈতিক পালাবদলের পর জেলার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। জেলার তিনটি আসনই কার্যক্রম-নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এবার নির্বাচনে দলটি অনুপস্থিত। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে তিনটি আসনে দলীয় প্রার্থীর বিজয় তাদের অস্তিত্বের লড়াই।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতাকর্মীদের কাছে তাদের বিজয় প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দেখা দিয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা গণসংযোগ, পথ সভা, মোটরসাইকেল মহড়ার মাধ্যমে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ধারণা করা হচ্ছে, জেলার তিনটি আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন পর এমন একটি নির্বাচন আসছে, যেখানে মানুষ স্বস্তিতে ভোট দিতে পারবে। এবারের নির্বাচনে সব কটি আসনেই আওয়ামী লীগের ভোটার-সমর্থকদের কাছে টানার বিভিন্ন কৌশলে মাঠে কাজ করছেন বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীরা।

শরীয়তপুর-১ (শরীয়তপুর সদর-জাজিরা): সদর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন এবং জাজিরা উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে শরীয়তপুর-১ নির্বাচনী এলাকা গঠিত। এই আসনে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ, ১৯৭৯ সালে বিএনপি, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ, ২০০১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিজয়ী হন।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সাঈদ আহমেদ আসলামকে। তিনি শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। তার মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে ২৮ নভেম্বর জেলা শহরে মশাল মিছিল এবং ২৭ নভেম্বর জাজিরা উপজেলার কাজীর হাটে শরীয়তপুর-ঢাকা সড়ক অবরোধ করে মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি সরদার এ কে এম নাসির উদ্দীন কালুর সমর্থকরা।

বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাঈদ আহমেদ আসলাম দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই পথসভা, গণসংযোগ, মোটরসাইকেল মহড়া দিয়ে তার নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ আসনে জামায়াতের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ড. মোশারফ হোসেন মাসুদ। তিনিও বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়া এ আসন থেকে ইসলামী আন্দোলনের মুফতি তোফায়েল আহম্মেদ কাশেমী, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ইমরান আল নাজির, এনসিপি কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক রিয়াজ মোর্শেদ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাজিরা উপজেলার লে. কর্নেল (অব.) নজরুল ইসলাম রাসেলের নাম শোনা যাচ্ছে। এ আসনে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে হচ্ছে।

শরীয়তপুর-২ আসন (নড়িয়া-সখীপুর): নড়িয়া উপজেলার একটি পৌরসভা, ১৪টি ইউনিয়ন এবং ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখীপুর থানার ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে শরীয়তপুর-২ নির্বাচনী এলাকা গঠিত। এ আসনে ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালে আওয়ামী লীগ, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি এবং ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিজয়ী হন।

এবার এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি শফিকুর রহমান কিরণকে। আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত এ আসনে ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থী এনামুল হক শামীমের নিকট পরাজিত হয়েছিলেন।

তিনি নিয়মিত নড়িয়া উপজেলা ও সখীপুর থানার বিভিন্ন এলাকায় ধানের শীষের পক্ষে গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয়প্রতিষ্ঠানে প্রচারণা চালাচ্ছেন। সখীপুর থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা এবং কীর্তিনাশা নদীর ওপরে নির্মাণাধীন সেতুর কাজ সমাপ্ত করাসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন।

এ আসনে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ডক্টর ফোরামের (এফডিএস) সেক্রেটারি ডা. মাহমুদ হোসেন বকাউল, তিনি তার নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি নড়িয়া ও সখীপুরের কয়েকটি স্থানে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন।

এ আসনে খেলাফত মজলিশের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক দাবির হোসেন শেখ ও ইসলামী আন্দোলনের অ্যাডভোকেট মানিক হোসেন মিয়া একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। এনসিপির জেলা যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন মিন্টু (আদর), গণঅধিকার পরিষদের আক্তারুজ্জামান সম্রাটের নামও শোনা যাচ্ছে।

শরীয়তপুর-৩ (ভেদরগঞ্জ-ডামুড্যা-গোসাইরহাট): ভেদরগঞ্জ উপজেলার চারটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা, ডামুড্যা উপজেলার একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন, গোসাইরহাট উপজেলার একটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়ন নিয়ে শরীয়তপুর-৩ নির্বাচনী এলাকা গঠিত।

এ আসনে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ, ১৯৭৯ সালে মুসলিম লীগের ইব্রাহিম খলিল, ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি, ১৯৯১, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয়লাভ করেন।

এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাবেক এপিএস মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুকে। তিনি এ আসন থেকে ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত হন। নির্বাচন চলাকালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর তিনি ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্ত হন। তিনি ইতিমধ্যে তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। গ্রাম, হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রতিনিয়ত গণসংযোগ ও উঠান বৈঠক করছেন। তিনি নির্বাচিত হলে জেলাকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে গড়ে তুলবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হচ্ছেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম। তিনিও বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠান বৈঠক, গণসংযোগ করে যাচ্ছে। এ আসনেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থী। এদিকে খেলাফত মজলিশ জেলা কমিটির সহসভাপতি মুফতি খবির উদ্দিন ও ইসলামী শাসনতন্ত্রের জেলা কমিটির নেতা অ্যাডভোকেট মো. হানিফ মিয়া প্রার্থী হয়েছেন। এছাড়া এনসিপির জেলা কমিটির সভাপতি শরীফ হোসেন জুয়েল ও গণ অধিকার পরিষদের জাকির হোসেন দুলালের নামও প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে।