অন্তর্বর্তীকালীন সরকারঘোষিত আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দিনাজপুর জেলার ছয়টি আসনে আগাম প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। ছয় আসনেই বইছে নির্বাচনী হাওয়া। প্রার্থী ও তাদের পক্ষের লোকজন শুরু করেছে দৌড়ঝাঁপ।
বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতারা প্রতিদিনই গণসংযোগ করে ভোটারদের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে তিনটি আসনে প্রার্থী নিয়ে দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তবে দিনাজপুর-১ (সদর) আসনে বেগম খালেদা জিয়াকে প্রার্থী ঘোষণা করায় এখন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা।
অন্যদিকে, আগে থেকে মাঠে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বেশ কিছুদিন আগেই ছয়টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করায় মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন জামায়াত প্রার্থীরা। স্থানীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের কথা বললেও দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় জাতীয় পার্টি (জাপা)।
জোট নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় এককভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। বাম দলগুলোর মধ্যে চারটি আসনে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। ছয়টি আসনেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও গণ অধিকার পরিষদ।
দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল): ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছাড়া বীরগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটিতে কখনো জেতেনি বিএনপি। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জয় পেয়েছিল জামায়াত।
এবার কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনজুরুল ইসলামকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। এই আসনে ঢাকা মহানগর উত্তরের মজলিশে শুরা সদস্য ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের দিনাজপুর শহর শাখার সাবেক সভাপতি মতিউর রহমানকে প্রার্থী করেছে জামায়াত।
আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের চান মিঞা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মোশাররফ হোসাইন, জেলা বাসদের সদস্য আবদুল্লাহ আল মুনীর, গণ অধিকার পরিষদের রিজওয়ানুল ইসলাম ও মাহমুদুল হাসান, এনসিপির জেলা কমিটির সদস্য জেমিয়ন রয় ও আবু বক্কর দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহ করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দিনাজপুর-২ (বিরল-বোচাগঞ্জ): দিনাজপুরের ভারত সীমান্তবেষ্টিত বিরল ও বোচাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত দিনাজপুর-২ আসন। এই আসনে বোচাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন।
সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক বলেন, ‘এই আসনে আমার কয়েকজন সহযোদ্ধাও মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। দল আমাকে মনোনয়ন দেওয়ায় অন্যরা অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তবে আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। নির্বাচন ঘনিয়ে আসলেই আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষকে বিজয়ী করার জন্য কাজ করব।’
আসনটিতে এবার প্রথমবারের মতো প্রার্থী হচ্ছেন জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য এ কে এম আফজালুল আনাম। তিনি বলেন, ‘সব দিক বিবেচনা করে ভোটাররা আমাকে কথা দিচ্ছেন।’
এছাড়াও ইসলামী আন্দোলনের জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক রেদওয়ানুল কারীম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জেলার সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের সাঈদ, গণ অধিকার পরিষদের জেলার সাধারণ সম্পাদক গোলাম আজম এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একরামুল হক আবির নির্বাচনী তৎপরতা চালাচ্ছেন।
দিনাজপুর-৩ (সদর): দিনাজপুর জেলার প্রাণকেন্দ্র দিনাজপুর সদর উপজেলা নিয়ে দিনাজপুর-৩ আসন গঠিত। এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন অর্ধডজন নেতা। বিভিন্ন সময় পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে তারা আলোচনায় ছিলেন। কিন্তু গত ৩ নভেম্বর দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে প্রার্থী ঘোষণা করায় সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। নেতাকর্মীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারণাও শুরু করেছেন।
খালেদা জিয়ার পৈত্রিক নিবাস হওয়ায় আসনটি ‘বিএনপির ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনসহ টানা তিন বার জয় পেয়েছিলেন খালেদা জিয়ার বোন খুরশীদ জাহান হক। দিনাজপুরের কন্যা হিসেবে পরিচিত বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবারই প্রথম প্রার্থী হচ্ছেন এই আসনে।
আসনটিতে কয়েক মাস ধরে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন জামায়াতের অ্যাড. ময়নুল আলম। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের জেলার সাধারণ সম্পাদক মুফতি খায়রুজ্জামান, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রেজাউল করিম ও বাসদের জেলার আহ্বায়ক কিবরিয়া হোসেন ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অঙ্গসংগঠন যুবশক্তির আরিফ মুন নির্বাচনী তৎপরতা চালাচ্ছেন।
দিনাজপুর-৪ (খানসামা-চিরিরবন্দর): খানসামা ও চিরিরবন্দর উপজেলা নিয়ে গঠিত দিনাজপুর-৪ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আক্তারুজ্জামান মিয়াকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। বিগত দেড় দশক নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন সাবেক এই সংসদ সদস্য।
এই আসনে কখনো জয় পায়নি জামায়াত। এখানে জেলা জামায়াতের সাবেক আমির আফতাব উদ্দিন মোল্লা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন। দুবার উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা আনোয়ার হোসেন নদভী, খেলাফত মজলিসের ফয়জুল্লাহ বুলবুল, এনসিপির সোহেল সাজ্জাত ও গণ অধিকার পরিষদের ইমরান খান নির্বাচনী তৎপরতা চালাচ্ছেন।
দিনাজপুর-৫ (ফুলবাড়ী-পার্বতীপুর): খনি সমৃদ্ধ এলাকা পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত দিনাজপুর-৫ আসন। এই আসনে গত আটটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি এবার ভোটে অংশ নিতে পারবে না।
এই আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এ জেড এম রেজওয়ানুল হক, যুক্তরাজ্য বিএনপির সহসভাপতি ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামান ও ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি খুরশিদ আলমের নাম আলোচনায় ছিল। তবে হাইকমান্ড কামারুজ্জামানকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন। এদিকে প্রচারে ব্যস্ত জামায়াতের প্রার্থী জেলা কর্মপরিষদের সদস্য আনোয়ার হোসেন।
এই আসনে অন্যান্য প্রার্থীর মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের শাহ মো. আবু সায়েম, বাসদ নেতা আবুল কালাম, গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শাহাজাহান চৌধুরী নির্বাচনী ও এনসিপির আবদুল আহাদ নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।
দিনাজপুর-৬ (বিরামপুর-নবাবগঞ্জ-ঘোড়াঘাট-হাকিমপুর): চারটি উপজেলা বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাট ও হাকিমপুর নিয়ে দিনাজপুর-৬ আসন গঠিত। এই আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন এখানে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে তিনি সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠকসহ এলাকায় নানা কাজ করছেন।
এই আসনে ৯ মাসের বেশি সময় ধরে আসনটিতে প্রচারণা চালাচ্ছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে এখানে জয় পেয়েছিল জামায়াত।
এছাড়াও, এবি পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সানী আবদুল হক, বাসদ নেতা আবদুল হাকিম, ইসলামী আন্দোলনের দিনাজপুর (দক্ষিণ) শাখার সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিক, খেলাফত মজলিসের মুফতি নুরুল কবির, গণ অধিকার পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার সহ-সভাপতি বুলবুল আহমেদ, এনসিপির জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা নির্বাচনী তৎপরতা চালাচ্ছেন।