৯৫৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মুন্সীগঞ্জে আসন সংখ্যা এখন তিনটি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলার তিনটি আসন জুড়েই বিএনপি ও জামায়াত সক্রিয়। নির্বাচনী মাঠে নানাভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে। মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা পরিচিতি বাড়াতে নিজের ছবি সংবলিত বিলবোর্ড, ফেস্টুন ও ডিজিটাল ব্যানার লাগিয়ে সরগরম করে তুলছেন ভোটের মাঠ। উন্নয়ন ভাবনার ফিরিস্তি নিয়ে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন।
মুন্সীগঞ্জের তিন আসনেই সম্ভাব্য চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। এবার মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে পুরোনো প্রার্থী বিএনপির; আর বাকি দুটিতেই নতুন মুখ। বিএনপি এখন মাঠ গোছাতে ব্যস্ত। তবে অন্তত দুটি আসনে দলটির প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। আর এ সুযোগে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মুন্সীগঞ্জে ভাগ বসাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে জামায়াত। কেউ কাউকে ন্যূনতম ছাড় দিতে নারাজ। এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মুন্সীগঞ্জ ১ ও ২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
মুন্সীগঞ্জের তিনটি আসনে নতুন হালনাগাদে ভোটার বেড়েছে ৭৭ হাজার ৮৬৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার বেড়েছে ৩৭ হাজার ৫৪১ জন ও মহিলা ভোটার বেড়েছে ৪০ হাজার ৩২৩ জন এবং হিজড়া ভোটার যুক্ত হয়েছে ৩ জন। খসড়া ভোটার তালিকা অনুসারে জেলার তিন আসনে বর্তমান মোট ভোটার ১৪ লাখ ১৯ হাজার ৬১৪ জন। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, ‘হালনাগাদের কাজ চলছে। চূড়ান্ত তালিকায় ভোটার আরও বাড়তে পারে। জেলার ৪৬৯টি কেন্দ্র অপরিবর্তিত থাকবে।’
মুন্সীগঞ্জ-১ (শ্রীনগর-সিরাজদিখান): শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলা নিয়ে গঠিত মুন্সীগঞ্জ-১ আসন। ২৮ ইউনিয়ন বিশিষ্ট আসনটিতে বর্তমান ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৩০৩। আসনটি নানা কারণেই আলোচিত। এটি বিগত দিনে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এ আসনে বিএনপি থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন দলটির সাবেক মহাসচিব ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি দল ছাড়ার পর এখানকার নেতারা একাধিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে এখন বিএনপির শিবিরে সুবাতাস বইছে। কিন্তু নিজেদের মধ্যে কাদা-ছোড়াছুড়ির কারণে বিপাকে পড়তে পারে বিএনপি।
এই আসনে সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শেখ মো. আব্দুল্লাহ দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। গত ৩ নভেম্বর প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই তিনি প্রতিদিন উঠান বৈঠক, গ্রামে-গঞ্জে গণসংযোগ, স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সমাবেশ, তরুণ ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় চালিয়ে যাচ্ছেন। পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল মুসলিম গ্রুপের কর্ণধার তিনি। দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী তার সঙ্গে রয়েছেন। এই আসনে বিএনপি থেকে শেখ মো. আব্দুল্লাহর মনোনয়ন পাওয়া ‘চমক’ হিসেবে দেখছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
তবে এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় কমিটির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু এবং জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মমিন আলী মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার পর ঐক্য করেছেন। সঙ্গে রয়েছেন সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুল কুদ্দুস ধীরন। তারা মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন।
২০০৪ সালের ৬ জুন আসনটির আলোচিত উপনির্বাচনে বিকল্পধারার মাহী চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিএনপির প্রার্থী হন মমিন আলী। পরাজিত হলেও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। শোনা যাচ্ছে, মমিন আলী দলীয় টিকিট না পেলেও নির্বাচনে অংশ নেবেন। তবে তিনি এখনো আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুনর্বিবেচনা করে আমাকেই মনোনয়ন দেবে দল।’
অন্যদিকে শেখ মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণার পরপরই তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের নির্বাচন করার আহ্বান জানিয়েছেন।’
আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক একেএম ফখরুদ্দীন রাজী। তিনি পুরো এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘জনগণ যদি সুযোগ দেয়, তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কাজ করব।’
আসনটিতে বিএনপির অন্তঃকলহের সুযোগ নিতে পারে হেফাজতে ইসলাম। এক্ষেত্রে সংগঠনের সহ-সভাপতি ও খতমে নবুওয়াত সংরক্ষণ কমিটির আমীর মধুপুরের পীর সাহেব আল্লামা আব্দুল হামিদ এ আসনে প্রার্থী হতে পারেন। আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হচ্ছেন কে. এম. আতিকুর রহমান। আর জাকের পার্টি থেকে প্রার্থী হচ্ছেন সারোয়ার সানী। অন্যদিকে এনসিপির মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে আলী নেওয়ার উজ্জ্বলকে।
মুন্সীগঞ্জ-২ (টঙ্গীবাড়ি-লৌহজং): ২৩ ইউনিয়ন বিশিষ্ট এ আসনের বর্তমান ভোটার ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৪২৮। পদ্মা সেতু তথা পর্যটন হাব মাওয়া এই আসনটির অন্তর্ভুক্ত। পদ্মা নদীর ভাঙনে ক্ষতবিক্ষত জনপদটিতে সপ্তম ও অষ্টম সংসদের বিএনপির এমপি মিজানুর রহমান সিনহা এবারও দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি বিএনপি সরকারের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। একমি গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান সিনহা এবারও বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ি উপজেলা জুড়ে সক্রিয়ভাবে গণসংযাগ করছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, সিনহার দলমত নির্বিশেষে ব্যক্তিগত ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তাকে এ আসনে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ড. এস. এম. আসাদুজ্জামান রিপন ও নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ এই আসনে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তবে সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণার পর এখনো তাদের এক মঞ্চে দেখা যায়নি। তাই বিএনপি এখানে ঐক্যবদ্ধ না থাকলে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নিতে পারে।
এনসিপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন প্রধান সমন্বয়ক মাজেদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জনগণ রায় দিলে মাদকমুক্ত, সুশিক্ষিত, দক্ষ ও কর্মসংস্থানমুখী নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলব। কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ বাড়িয়ে দারিদ্র্যের শৃঙ্খল ভাঙব।’
আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য, সাবেক জেলা আমীর অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করিম। তিনি প্রতিদিন মাঠে সরব প্রচার-প্রচারণা ছাড়াও উঠান বৈঠক করছেন। তিনি বলেন, তিনি বিজয়ী হলে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের নদীতীর আরও নান্দনিকভাবে বাঁধাই করে পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করবেন।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান সিনহা বলেন, তিনি বিজয়ী হলে এলাকার সব প্রয়োজনীয় উন্নয়ন করা হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার মানোন্নয়ন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি এবং বালু লুটপাট বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মুন্সীগঞ্জ-৩ (গজারিয়া-সদর): দুটি পৌরসভা ও ১৭ ইউনিয়ন বিশিষ্ট এ আসনে বর্তমান ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৬ হাজার ৮৮৩। এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজ কল্যাণ সম্পাদক মো. কামারুজ্জামান রতনকে। এ আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মহিউদ্দিন। তবে দল থেকে কামারুজ্জামানকে মনোনয়ন দেওয়ার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন মো. মহিউদ্দিনেরর সমর্থকরা। কামারুজ্জামান রতনের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে প্রতিদিন অবরোধ, বিক্ষোভ, মশাল মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন।
আসনটিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু ইউসুফ জামায়াতের প্রার্থী। তিনি এখন ঘরে ঘরে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ পরিবর্তন চায়। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চাই।’
এদিকে বিএনপি প্রার্থী কামরুজ্জামান রতন বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জ ও গজারিয়ার মধ্যবর্তী মেঘনা ও ফুলদি নদীতে সেতু নির্মাণ করা হবে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার উন্নয়নে কাজ করব।’ নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে এই আসনে বিএনপির অন্তঃকলহ প্রকট। ঐক্য ফিরিয়ে আনতে না পারলে বিএনপি জটিল সমীকরণে পড়তে পারে। এদিকে এনসিপি চেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি ঘরানার একজনকে প্রার্থী করতে।