মানব-মানবীর সংবেদনশীলতায় সৃষ্ট জীবনরহস্যের গাঢ় আবেদন কবিতার অন্তর্গত ভূমিকে আর্দ্র করে তোলে। সখেদে যা উচ্চারণ করেন তার মধ্যে থেকে আমাদের চেনা জগত্ খুঁজে পাওয়া যায়। ‘এই গৃহ, এই সন্ন্যাস’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে ১৯৭২ সালে তাঁর যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা আজ দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় পরিণত। কবিতা দর্শনের ও জীবনের টানাপোড়েন শুদ্ধ সুষমার জন্ম দেয়। মহাদেব আধুনিক। তাঁর কবিতায় মানবিক সম্পর্ক, বেড়ে ওঠা ও সময় অতিক্রমনের জীবন্ত গাথা যেন সৌন্দর্যের আধার। নিত্যদিন দেখা, কথাবার্তা আর ভাব বিনিময়ের মধ্যে প্রেম জাগ্রত থাকে। প্রেমাস্পদের স্পর্শে ধন্য হয়ে ওঠে মন। প্রেমে বিরহ এক মৌলিক সত্তা। ফেসবুক, ইন্টারনেট, মুঠোফোনের যুগে যোগাযোগের কষ্ট কাউকে পীড়া দেয় কি না, আমরা জানি না। একসময় যোগাযোগের এই আধুনিক মাধ্যম ছিল না, তখন ‘চিঠি’ ছিল মনের ভাব আদান-প্রদানের প্রতিনিধি। প্রেমের আকুতি ছিল। প্রেমিক কত আবেগে উচ্চারণ করেছেন :
করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও/আঙুলের মিহিন সেলাই/ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলে তাও,/এটুকু সামান্য দাবী চিঠি দিও, তোমার শাড়ীর মতো/ অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।/চুলের মতন কোন চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও/সমুদ্র বোঝাতে চাও, মেঘ চাও, ফুল পাখি সবুজ পাহাড়/ বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখের মতো চিহ্ন কিছু দিও!/
আজো তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি,/আসবেন অচেনা রাজার লোক/তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে।/এক কোণে শিশির দিও এক ফোঁটা, সেন্টের শিশির চেয়ে/তৃণমূল থেকে তোলা ঘ্রাণ।/এমন ব্যস্ততা যদি শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো তোমার কুশল/
... ... ... ...
কিছুই লেখার নেই তবু লিখো একটি পাখির শিস/একটি ফুলের ছোট নাম/টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে কিছুই হয়তো পাওনি খুঁজে/সেই সব চুপচাপ কোন দুপুর বেলার গল্প/ খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড়ো একা লাগে তাই লিখো/করুণা করেও হলো চিঠি দিও, মিথ্যে করেও হলে বলো, ভালোবাসি।/
[ চিঠি দিও ]
বাংলা কবিতায় কবি মহাদেব সাহা স্বতন্ত্র ধারার এক কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতায় অনুভূতি, আবেগ ও জীবনের কলস্বর তীব্র। প্রেম ও প্রকৃতি যুগলবন্দি করে তিনি দীর্ঘপথ অতিক্রম করেছেন। বেঁচে থাকার আকুলতা, সংগ্রাম যূথবদ্ধ সুখ-দুঃখের পাঠ কবিতার চেতনাকে সংহত করেছে। তাঁর কবিতা জীবনালেখ্যের গভীর অনুরণনের দোলাচলে ভরপুর। হূদয়স্পর্শী পঙিক্তমালা অভিজ্ঞতা, জীবনযাপন ও স্বপ্নে বন্দি। নিত্যদিনের ঘটনা, দৃশ্যমান জগতের ভেতর অবগাহন শেষে একজন প্রকৃত কবি তুলে আনেন জীবনাভিজ্ঞতার উপাদান, কবিতায় ধরা পড়ে কবির বিচিত্র বোধ, যা শব্দ ও বাক্যে গ্রথিত হয়—এ সবকিছু মা, মাটি, মানুষ যার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কিত।
মহাদেবের কবিতায় প্রকৃতি ও প্রেম একাকার হয়ে আছে। দয়িতা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন তিনি প্রকৃতির কাছে আশ্রয় চাইবেন। একজন মানসপ্রতিমার আঁচলই হতে পারে প্রেমিক কবির আশ্রয়স্থল। ব্যথিত কবি সেবাশ্রম, স্বাস্থ্য নিবাস ছেড়ে মানসীর কাছে পরম শান্তি ও স্বস্তির জন্য পৌঁছে যাবেন। নর-নারীর শাশ্বত প্রেমাকাঙ্ক্ষী কবিতার ধ্যানমগ্ন কবি উচ্চারণে বলেন :
সবখানে ব্যর্থ হয়ে যদি যাই/তুমিও ফেরাবে মুখ স্নিগ্ধ বনভূমি/ক্ষুধায় কাতর তবু দেবে না কি অনাহারী মুখে দুটি ফল?/বড়োই ব্যথিত যদি কোন স্নেহ ঝরাবো না অনন্ত নীলিমা/সবাই ফেরাবে মুখ একে একে, হয়তো বা শুষ্ক হবে/সব সমবেদনার ধারা/তুমিও কি চির প্রবাহিনী নদী দেবে না এ তৃষিত অঞ্জলি ভরে জল?/আমার মাথায় যদি ঝরবে না কোন শান্তি বারি তবে কেন মেঘ দল?/সব সেবা শ্রম, স্বাস্থ্য নিবাস যদি করে অবহেলা,/ রোগে এক ফোঁটা/না দেয় ওষুধ/
তোমার ভেষজ বিদ্যা দিয়ে আমাকে কি সুস্থ করে তুলবে না প্রকৃতি/খোলা রাখবে না স্যান্যাটোরিয়াম?/উদ্ভিদ দেবে না ঘ্রাণ নাকে মুখে যাতে পুনরায় জ্ঞান ফিরে আসে।/
... ... ... ...
[সবাই ফেরালে মুখ]
মহাদেব সাহা বাংলা কবিতায় জাগর উচ্চারণ ও মানবিক জাগরণের সুতীব্র জীবনবোধ কবিতায় সংস্থাপন করেছেন। বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যলগ্নতা তাঁর কবিতাকে পেলবতা দান করেছে। ক্লান্তি, হতাশা দুঃখবোধ তাঁর কবিতার সহজাত উপাদান। প্রেম, প্লেটোনিক আকর্ষণ ও বিরহের অনুরণনও আমরা কান পেতে থাকলে শুনতে পাই। সৌন্দর্য সন্ধান করে কবি নিজেকে চিহ্নিত করেছেন।
একে একে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : মানব এসেছি কাছে (১৯৭৩), চাই বিষ অমরতা (১৯৭৫), কী সুন্দর অন্ধ (১৯৭৮), তোমার পায়ের শব্দ (১৯৮২), ধুলোমাটির মানুষ (১৯৮২), মানুষ ক্রন্দন জানে না (১৯৮৪), ফুল কই শুধু অস্ত্রের উল্লাস (১৯৮৪), লাজুক লিরিক (১৯৮৪), নির্বাচিত কবিতা (১৯৮৯), প্রথম পয়ার (১৯৯০), কোথা সে প্রেম, কোথা সে বিদ্রোহ (১৯৯০), প্রেমের কবিতা (১৯৯১), মহাদেব সাহার রাজনৈতিক কবিতা প্রভৃতি।
শ্রাবণে অবগাহিত মহাদেব সাহা ‘শ্রাবণ’বন্দনায় মুখর। তাঁর কবিতা অশ্রুসজল, বেদনাবিধুর। গ্রামে তাঁর জন্ম। সে কারণেই বোধ হয় বুকের ভেতর এক অনন্ত শ্রাবণকে তিনি ধারণ করেছেন। মহাদেব তাঁর আবেগ, অনুভূতির সঙ্গে একা্ত হয়ে প্রকৃত কবির দুঃখ-কষ্টে লীন হয়ে আছেন। প্রকৃতি, নদী, মানুষ, বর্ষা তাঁর কবিতায় বার বার ফিরে আসে। স্মৃতি, গ্রাম, মন কেমন করা প্রহর নিয়ে অঝোর শ্রাবণধারায় মহাদেব শেকড়সংলগ্ন হয়ে পড়েন। ব্যস্ততার ভিড়ে এই শহরে কিংবা প্রবাসে তাঁর গ্রাম স্মৃতি ফুঁড়ে ওঠে। সঙ্গতকারণে নদীর কাছে পাওয়া না-পাওয়ার গল্প বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। নদী কারো ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখে উত্তাল হয়ে ওঠে না। নদী সর্বংসহা মায়ের মতো স্নেহধারায় বহমান। নদী স্রোতস্বিনী। তাঁকে বলতে শোনা যায় :
বড়ো ইচ্ছে করে নদী, কিছুক্ষণ তোমার পাশে গিয়ে দাঁড়াই/শৈশবে মন খারাপ হলে যেমন তোমার কাছে গিয়ে দাঁড়াতাম/একবার বুক উজাড় করে সব কথা তোমাকে বলি/দু’হাতে এই মুখ ঢেকে কতো যে কাঁদি, কেউ তা জানে না।/কী যে ভালো হয় আজ যদি তোমার জলে/ সব কলঙ্ক ধুয়ে ফেলি।
... ... ... ...
মহাদেব গীতল প্রেমের কবিতার মধ্য দিয়ে অনন্ত তৃষ্ণাকে ধারণ করেছেন। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, চাওয়া-পাওয়ার তাড়না তাঁর কবিতাকে সৌন্দর্যময় করে তুলেছে। বিষাদ-কাতরতা তাঁর নিত্যসঙ্গী। দুঃখবিলাস নয়, দুঃখজয়ের মন্ত্রণা মহাদেব সহজে করায়ত্ব করে পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘপথ। কত আপন করে তাই তাঁকে বলতে শুনি : ‘হায় আমার দুঃখ আছে কত রকম/ বুকের ক্ষত/ বুকের গাঢ় জখম/ মা যেমন বলেন/ হলো না তার ঘটি বাটি সোনার বাসন/ ন্যায্য আসন/ সবাই আমরা দুঃখ করি/ দুঃখ করি হাজার রকম/ সবাই এই বুকের নীচে সুনীল জখম/ সবাই আমরা দুঃখ করি/ একটা কিছুই দুঃখ করি/ ঘটি বাটি, বসত বাড়ি, ফুলদানী বা সোনার বাসন/ নিজের জন্য হলো না ঠিক যোগ্য আসন/ হাত বাড়াবার শক্ত লাঠি/ পরিপাটি সোনার জীবন হলো না ঠিক/ যেমনটি চাই /দুঃখ করি/ দুঃখ আছে কত রকম।’
নারী ও প্রকৃতি, প্রেম আর কাতরতা মহাদেবের কবিতায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংযোজিত। তিনি একদিকে বাউল অন্যদিকে প্রেমিক ও আগন্তুক। তাঁর কবিতায় যাপিত জীবনের যন্ত্রণা ও আনন্দ প্রকাশিত। প্রায় ৮০ খণ্ডের কাব্যগ্রন্থে নিরন্তর প্রণয়-বিরহ, সংগ্রাম ও রক্তাক্ত হওয়ার বিবরণ বিধৃত। এ সত্যগুলো আমাদের বলতে হবে। তিনি শীর্ষ কবি। তাঁর কবিতায় সুঘ্রাণ, তীব্রতা ও দহনের অবিরাম শব্দ প্রতিধ্বনি হয়। পাওয়া কিংবা হারানোর মধ্যে থেকে তিনি ‘প্রেম’ স্পর্শ করে মানবীর এই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেন :
একটি নারীও যদি অবশিষ্ট থাকে একটি/ গোলাপও যদি উন্মোচিত/রাখে তার বুক,/আমি শুধু তারই জন্য আরো দীর্ঘদিন বেঁচে/থাকবো, বেড়াবো।/মনে হয় না কোথাও একটি নারী থাকতে এ/শরীর ঢলে পড়ে/যাবে, জ্বর হবে, অম্লপীড়া হবে/
মহাদেব সাহার কবিতায় খণ্ড খণ্ড চিত্র ভেসে ওঠে। নাগরিক জীবনের কোলাহল, ক্রুরতা, অগ্নিতাপের মাঝে তিনি শীতলতা খুঁজে ফেরেন। তাঁর কবিতায় ঐতিহ্যের নিদর্শনের অনুসন্ধান অব্যাহত আছে। উপমা-উেপ্রক্ষা, চিত্রকল্প ও নন্দনতত্ত্বের চারদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, প্রেম-স্মারক ও প্রকৃতি স্বমহিমায় উজ্জ্বল। হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা আক্রান্ত একদল মানুষ পৃথিবীর সুন্দর তছনছ করে দিচ্ছে। মহাদেব মানুষের রুঢ়তায় কষ্ট পেয়েছেন :
মানুষের ঘরে জমেছে অনেক হিংসা,/কিন্তু কোনো ভালোবাসা নেই/ তবে কি ফুরিয়ে গেছে মানুষের হূদয়ের যা কিছু সঞ্চয়,/অনেক জমেছে তার নোট, টাকাকড়ি, সোনার মোহর/কিন্তু কেন নেই একটি বৃক্ষের ছায়া, দুটি কচিপাতা/
নেই সামান্য শিশির, একটু ঝরনাধারা এক বিন্দু জল।
ধ্বংসের মধ্যে সৃষ্টির উল্লাস তাঁর অন্বেষার বিষয়। শেকড়লগ্ন কবি প্রকৃতি, মানুষ, জন্মগ্রামে ফিরে যাবার আর্তি প্রকাশ করেন। তাঁর যাত্রা ইতিহাস, ঐতিহ্য, বীরযোদ্ধা আর জন্মভূমির সোনালি দিনের দিকে। মহাদেব ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিশেষ করে পঁচাত্তরের মর্মন্তুদ ঘটনা জাতির পিতার হত্যাপরবর্তী ঘটনা আপন যত্নে কবিতার অংশ করেছেন।
স্বাধীনতাপরবর্তী সামরিক শাসন, স্বৈরাচারের অগণতান্ত্রিক কর্মযজ্ঞে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু মহাদেব সাহাকে ব্যথিত করেছে। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ উচ্চকিত হয়েছে :
বাংলাদেশ চায় না তোমাকে, তুমি চলে যাও, যাও/কতো যে মায়ের খালি বুক ফেলে দীর্ঘশ্বাস—/রক্তমাখা হাত, তুমি ক্ষমা চাও, ক্ষমা ভিক্ষা চাও।/তোমাকে চায় না এই সোনালী ধানের ক্ষেত, কচি দূর্বা, দীর্ঘ শালবন/চায় না ভোরের মুখ, কলাপাতা, গায়ের উঠোন;/ কতো না পিতার বক্ষে তুমি জ্বেলেছো আগুন তুমি চলে যাও;
বলা যায়, মহাদেব সাহা আত্মজৈবনিক কবি। তিনি কবি হয়েছেন অনুভূতিপ্রবণ মনন ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার অভিঘাতে। তাঁর জীবনে যেমন অপার আনন্দ আছে তেমনি রয়েছে বেদনা ও বিরহের প্রশান্ত ছায়া। সমাজের অবক্ষয়, মানবিক বিপর্যয়, সমাজব্যবস্থার অসমতা ও মানুষের অন্তর্গত বোধ তাঁকে কবি হিসেবে আবির্ভূত হতে সাহায্য করেছে। তাঁর কবিতা সমকালীনতা, রাজনীতি, প্রেম, বিরহ-বেদনায় আকীর্ণ। নারী-নিসর্গ সমানভাবে উপস্থিত থাকে তাঁর কবিতায়। নস্টালজিয়া ও জন্মগ্রামের টান মহাদেব উপেক্ষা করতে পারেন না। সাম্য ও সৌম্যের দিকে তাঁর পক্ষপাত। তাঁর অভিজ্ঞ বাণীমালা মহাকালের গর্ভে গভীর চিহ্ন রেখে যাবে—এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কবি মহাদেব সাহার ৭৬তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।
মহাদেব সাহা, জন্ম :৫ আগস্ট ১৯৪৪