লালের অনুভূতি লালের বৈভব

 ‘লাল কোনো রং নয়—Red is not a colour’এই শিরোনামে দ্বীপ গ্যালারিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হল শিল্পী সঞ্জয় চক্রবর্ত্তীর ভিন্নমাত্রার এক চিত্রপ্রদর্শনী। প্রদর্শনীর এই অভিনব শিরোনামই প্রশ্নাতুর করে তুলে দর্শকমন : কেন এই শিরোনাম? ‘লাল’ রঙের মতো এমন চোখ ধাঁধানো রং আবার কী করে রং না হয়ে পারে? যে শিল্পী চিরকাল লাল রঙের মধ্য দিয়েই তাঁর বিচিত্র সৃজনশীলতা প্রকাশ করে এসেছেন, তাঁর আঁকা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী হলে প্রদর্শনীর নাম কেন হবে ‘লাল কোনো রং নয়’?

প্রশ্নটা সরাসরি শিল্পীকে করতেই, মনে হলো, আগেও বহুজন তাঁকে এ প্রশ্ন করেছেন। মুচকি হেসে তিনি জবাব দেন, ‘লাল যখন অন্য কোনো রঙের সাথে দেখতে পাওয়া যায়, তখনই তা হয় রং। কিন্তু শুধু লাল নিয়ে যদি কথা বলার চেষ্টা করা হয়, বিশেষ কিছু প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়, তখন তা আর শুধু রং থাকে না।’ অর্থাত্ যা বুঝলাম, তাতে এমনটা দাঁড়াবে ‘Red is beyond colour’ মানে, এখানে রঙের ঊর্ধ্বে গিয়ে লাল প্রকাশ্যমান। প্রদর্শনীর কিউরেটর মুস্তফা জামান প্রদর্শনীর এ বিশেষ নাম রাখেন বলে, জানান শিল্পী সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী।

শিল্পী সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী—সময়ের তরুণ দৃশ্যশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের চারুশিল্প জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত, লাল রঙের ব্যবহার যাঁর শিল্পকর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য। শিল্পীর ভাষ্যমতে—মানুষের শরীরে বহমান লাল রক্ত, যা গোটা পৃথিবীর মানুষকে এক ও অভিন্ন বলে প্রমাণ করে, সে রক্তের লাল রংই আমার শিল্পকর্মের প্রকাশ্যমান, গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। রাজধানীর দ্বীপ গ্যালারিতে গত ১২ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীতে শিল্পী সেই লাল রঙেরই এক অভিনব প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

গ্যালারির প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতে সামনে তাকাতেই চোখে পড়ে বেশ বড় করে আঁকা একটি চিত্রকর্ম। তাতে শহরের দালান ঘিরে সর্পিল জন্তুর অবস্থান, যেন শহরের যান্ত্রিকতা, হতাশা, অস্তিত্ব সংকট মানুষকে পুঞ্জীভূত করে রেখেছে। তাঁর চিত্রকর্মে অঙ্কিত সেই সর্পিল জন্তু কোনো অপশক্তির প্রতীক। তবে কি তিনি শহরকে নেতিবাচক দৃষ্টি দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন বারবার? গ্যালারির বেশ কয়েকটি চিত্রকর্মেই এমনটা দেখা যায়। এরপর ডানদিকে তাকাতেই দেখা গেল ওপর-নিচ করে রাখা দুটি ছবি। শিল্পীর মুখমণ্ডলের পেছনে গ্রাম, ঠিক তার নিচের চিত্রে শিল্পীর মুখমণ্ডলের সামনে শহর। শিল্পীর জীবন শুরু হয় গ্রামে, গ্রাম থেকে শহরে, প্রথমে চট্টগ্রাম, সেখান থেকে কোলকাতা শহর, তারপরই কর্মসূত্রে ঢাকা। পেছনে ফেলে আসা গ্রামের বড় মাঠ, তারপর শহরের কোনো এক কংক্রিটের বাড়ির ছাদ—শিল্পী যেন মানতেই পারেন না। বারবার ফিরে যেতে চান ফেলে আসা সবুজ নিসর্গ-প্রকৃতির কাছে, ঠিক যেন জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো, শিল্পীও বাংলার নদী-মাঠ, শস্যক্ষেত ভালোবেসে ফিরতে চান শিকড়ের কাছে। পাশাপাশি তুলির মোলায়েম আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলতে  চেয়েছেন গাছের পাতা, আর সে পাতা নিজের শরীরে ধারণ করে, প্রকৃতির মাঝে বসবাসের অপার আকুতি উত্কীর্ণ করেছেন তাঁর শিল্পকর্মে।

শিল্পী তাঁর শিল্পকর্মে বারবারই দর্শকের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েছেন। মানুষের মাঝে মিশে গিয়ে, পথে নেমে বা পথে না নেমে শিল্পকে প্রদর্শন—শিল্পীর শিল্পকর্মের আঙ্গিক প্রবণতা। জনসাধারণের অংশগ্রহণে শিল্পপ্রকাশের এক অভিনব মাধ্যমে তিনি প্রায় এক দশক ধরে বিচরণ করে এসেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় কাজ করেন মিনিয়েচার ঘরানায়। প্রদর্শনীর বেশির ভাগ কাজই মিনিয়েচার-যেন, দর্শক দূর থেকে নয়, বরং সশরীরে কাছে গিয়ে দেখতে পান তাঁর চিত্রকর্ম। এতে দর্শকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত থাকে বলে শিল্পী সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী মনে করেন।

প্রদর্শনীর মিনিয়েচার কাজগুলোকে আমার বিবেচনায় চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে ‘মি অ্যান্ড মাই সিটি’ শিরোনামের কাজগুলো, যা তাঁর অস্তিত্বের, লড়াইয়ের গল্প বলে। দ্বিতীয় ভাগে, ঐতিহ্য রক্ষার বার্তাবহনকারী ‘হিস্ট্রি মাস্ট ডাই’ শীর্ষক চিত্রকর্মগুলো। যেখানে আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় যেন ধ্বংস না হয়ে যায়, সে ব্যাপারে শিল্পীর উপস্থাপনা লক্ষণীয়। তৃতীয় ভাগে রয়েছে, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আঁকা চিত্রকর্মগুলো। স্পষ্ট হয়ে চোখে ধরা দেবে চাপাতি আর ধর্মের পরিচয়ে আঁকা রং ও রেখা। দেশে যখন একের পর এক ব্লগার হত্যা করা হচ্ছিল স্পর্শকাতর শিল্পী তারই প্রতিবাদস্বরূপ নির্মাণ করেন সে সকল শিল্পকর্ম। চতুর্থ ভাগে ‘মি, আর্ট অ্যান্ড পলিটিক্স’ শিরোনামের কাজগুলোতে ফুটে উঠেছে, কাঁটাতার এবং কাঁটাতার দিয়ে বিভক্ত হয়ে যাওয়া বাঙালি জাতিসত্তা। এখানে শিল্পী নিজের খণ্ডিত শরীরকে কাঁটাতারে আটকে দুই বাংলার অবাধ বিচরণের পথে অন্তরায়ের আক্ষেপ তুলে ধরেছেন। এর মধ্য দিয়ে যেন বিভক্ত বাংলায় বাঙালির একই সুতোয় গেঁথে থাকার আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শিল্পী সঞ্জয় চক্রবর্ত্তীর এই প্রদর্শনীতে গ্যালারি মুখরিত ছিল তাঁর ছাত্র-ছাত্রী আর শুভানুধ্যায়ীদের উপস্থিতিতে। পুরো গ্যালারি জুড়ে লাল রঙের চিত্রকর্ম, লোকে একরকম আকৃষ্ট হয়েই এসেছেন, দেখেছেন, উপভোগ করেছেন। শিল্পীর বিগত দশ বছরের অঙ্কিত চিত্রকর্ম নিয়ে প্রদর্শনীটি সাজানো হয়। লালের এরূপ ভিন্নধর্মী উপস্থাপনে দর্শক শিল্পীর চোখ দিয়ে দেখার সুযোগ পেলেন—গ্রামবাংলা, বাংলার সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও দর্শন।