‘‘বিদায়, অবন্তী’’—ইতিহাস, পরিচয় ও রুচির এক বিষণ্ণ প্রস্থান

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ রচিত “বিদায়, অবন্তী” কেবল একটি প্রেমভিত্তিক ছোটগল্প নয়, এটি বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের একটি সময়, একটি চেতনা, একটি সাংস্কৃতিক ক্রান্তিকালের আলেখ্য। গল্পটি পড়লে প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে এটি এক পুরোনো প্রেমিকার বিদায়ের স্মৃতিকাতর পাঠ, কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যায়, অবন্তী আসলে এক রূপক—বাংলার হিন্দু রেনেসাঁসকেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলের প্রতীক। তাই তার প্রতি বিদায় শুধু একজন নারীর প্রতি নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক সময়ের, একটি রুচিশীল চেতনার প্রতি শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

উনিশ শতকে ইংরেজদের আগমনের ফলে ভারতবর্ষে, বিশেষ করে বাংলায়, একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দু শ্রেণির উত্থান ঘটে। ইংরেজ শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে এই শ্রেণি পাশ্চাত্য দর্শন, বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদে প্রবেশাধিকার পায়। তারা সাহিত্য, রাজনীতি, সামাজিক সংস্কার, নারীশিক্ষা—সব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে শুরু করে। এর ফলেই বাংলা রেনেসাঁর জন্ম হয়।

কিন্তু বাঙালি মুসলমান সমাজ, বিশেষ করে গ্রামীণ মুসলমানরা, এই নবজাগরণে অংশ নিতে পারেনি। ঔপনিবেশিক শাসকের কাছে ক্ষমতা হারানোর ক্ষোভ, ধর্মীয় সংস্কৃতির রক্ষণশীলতার বেড়াজাল এবং হিন্দু প্রাধান্যের ভয়ে মুসলমান সমাজ ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে অনাগ্রহী ছিল। ফলে এক ধরণের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। মুসলমানরা নিজেদের অভিমানবশত এই নবজাগরণ থেকে গুটিয়ে নেয়, নিজেদের রক্ষা করে ধর্মীয় আবরণে, সেইসঙ্গে বঞ্চিত হয়নি কি এক নতুন সভ্যতার ছোঁয়া থেকে?

গল্পের শিরোনামেই নিহিত আছে এক অন্তিম অনুভূতির প্রকাশ—বিদায়। কিন্তু এই বিদায় নিছক আবেগগত নয়, বরং সাংস্কৃতিকভাবে গভীর অর্থবহ। অবন্তীর বিদায় মানে রুচি, সংস্কৃতি, সাহিত্যচর্চা ও মানবিক পরিমার্জনার বিদায়। লেখক যেন বলতে চাচ্ছেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরে বাংলা মুসলমান সমাজ যে একধরনের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা ও আত্মনিমগ্নতায় পড়ল, তা অবন্তীর মতো একটি সময়ের ও মানসিকতার চূড়ান্ত প্রস্থান।

লেখকের সঙ্গে অবন্তীর সম্পর্কের ধরনও এই ধারণাকে দৃঢ় করে।  তিনি যেভাবে লেখকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন, তার মধ্যে কোনো আবেগাত্মক দুর্বলতা নেই, বরং রয়েছে সংযম ও বিবেচনার শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রকাশ। ঠিক এই কারণে অবন্তীকে বিদায় জানানো মানে হলো—সেই পরিশীলিতাকে, আত্মবোধকে, যুক্তিনির্ভর আবেগকে, সেই মানবিক স্বরকে বিদায় জানানো—যা ইংরেজদের আধিপত্যের যুগে গড়ে উঠেছিল, এবং দেশভাগের পর একপ্রকার লুপ্ত হতে থাকে।

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের গদ্য শৈলী বরাবরই পরিমিত এবং সংবেদনশীল। “বিদায়, অবন্তী” তেও এর ব্যতিক্রম নয়। গল্পটি বহির্জগৎ নয়, অন্তর্জগৎ নির্মাণ করে। এখানে চরিত্রের সংখ্যা কম, কাহিনী সরল, কিন্তু আবেগ ও চেতনার গভীরতা অসাধারণ। এক ধরনের আত্ম-উপলব্ধির বয়ান এটি, যেখানে লেখক নিজের ভেতরের ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেন। কোনো প্রতিক্রিয়া নয়, বরং প্রতিফলন। তিনি আক্ষেপ করেন, অনুশোচনা করেন, এবং শেষ পর্যন্ত এক ধরনের শান্ত সমাপ্তির মধ্য দিয়ে গল্পটির ইতি টানেন।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে “বিদায়, অবন্তী” গল্পটির তাৎপর্য আরও গভীর। বাঙালি মুসলমান সমাজ এখনও তার সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে দ্বিধায় পড়ে থাকে—একদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধ, অন্যদিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য। এই দ্বৈততার শিকড় বহু পুরনো, যার অন্যতম সূত্র এই গল্পে পাওয়া যায়।

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের “বিদায়, অবন্তী” গল্পটি এক গভীর সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক দলিল। এখানে অবন্তী কেবল একটি প্রেমিকা নন, তিনি এক সময়ের, এক চেতনার, এক পরিশীলিত সমাজবোধের প্রতীক। লেখকের বিদায় কেবল ব্যক্তিগত আবেগ নয়, বরং একটি বৃহত্তর জাতিগঠনের পথে ঘটে যাওয়া রুচি ও চিন্তার ক্ষয়মানতার মর্মান্তিক প্রকাশ।

অবন্তীকে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে লেখক আসলে বিদায় জানাচ্ছেন সেই “ রুচিশীলতা” কে, যা দুই শতকের ইংরেজ শাসনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল এবং যা দেশভাগের রাজনৈতিক বিভাজনে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এই বিদায় বেদনার, কিন্তু অনিবার্য—আর এই অনিবার্যতাই গল্পটির সবচেয়ে বড় সার্থকতা। 

বই: বিদায়, অবন্তী
প্রকাশনা: পার্ল পাবলিকেশন্স
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
মূল্য: ১০০ টাকা