আত্মপ্রকাশ করলো সাহিত্য পত্রিকা ‘অআকখ’। বাংলাদেশের সাহিত্য পত্রিকার ঐতিহ্য, সংকট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে এ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, চিন্তক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা সাহিত্য সাময়িকীর ভূমিকা, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
‘বাংলাদেশের সাহিত্য পত্রিকার সংস্কৃতির সম্ভাবনা, সংকট ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এই আলোচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহারসহ বিভিন্ন লেখক, সম্পাদক ও সাহিত্যকর্মীরা।
অনুষ্ঠানে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম বলেন, সাহিত্য পত্রিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মধ্য দিয়েই সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। লেখক, পাঠক, সম্পাদক ও প্রকাশনার নানা ধাপ অতিক্রম করেই একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তিনি বলেন, সংকট থাকবেই, তবে সম্ভাবনাও রয়েছে—আমাদের সেই সম্ভাবনাগুলো নিয়েই ভাবতে হবে।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, বাংলা সাহিত্যের ম্যাগাজিন সংস্কৃতি অত্যন্ত পুরোনো ও সমৃদ্ধ। একসময় ঢাকা মফস্বল শহর হলেও এখান থেকেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হতো। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা কিংবা প্রয়োজনীয়তা হারানোর কারণেই অনেক ম্যাগাজিন বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কাগজের বই শৌখিন বস্তুতে পরিণত হতে পারে, তবে সেই বাস্তবতায় ‘অআকথ’ অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই সমানভাবে কাজ করছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য পত্রিকাকে একটি প্রোডাক্ট হিসেবেও ভাবতে হবে, যেখানে পাঠক বা কনজিউমারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ তৈরি করা জরুরি।
কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, সাহিত্যের প্রধান কাজ হলো সম্পর্ক স্থাপন করা। প্রযুক্তির এই যুগে ডিজিটাল মাধ্যম অবশ্যই ব্যবহৃত হবে, কিন্তু মুখোমুখি বসে, সরাসরি আলাপের মধ্য দিয়েও সাহিত্যচর্চা চালু রাখতে হবে। সাহিত্য শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি গভীর ও সিরিয়াস বিষয়। তিনি বলেন, ডিজিটাল মাধ্যম যেমন সাহিত্যের প্রসারে সহায়ক, তেমনি তা দিয়ে প্রোপাগান্ডাও চালানো হয়। তাই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাহিত্যকে আধুনিক হতে হবে এবং সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সাহিত্যচর্চা জারি রাখতে হবে। অআকথ অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই সেই চর্চা ধরে রেখেছে, যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।
এক সময় লিটল ম্যাগাজিন ও সাহিত্য সাময়িকীগুলো ছিল সামাজিক পরিবর্তন ও বিপ্লবের হাতিয়ার। প্রেম, ভ্রাতৃত্ব ও দ্রোহ—সবকিছুর প্রথম প্রকাশ ঘটতো সাহিত্য সাময়িকীর পাতায়। বিশ্ব যখন দ্রুত আধুনিক হচ্ছে, কাগজের বই ই-বুকে রূপ নিচ্ছে, পত্রিকাগুলো অনলাইনে ঝুঁকছে—তখনও সাদা কাগজে কালো কালির হরফের আবেদন পুরোপুরি মুছে যায়নি বলেই বিশ্বাস করেন ‘অআকথ’-এর উদ্যোক্তারা। দীর্ঘ তিন বছরের পথচলায় তারা উপলব্ধি করেছেন, সাহিত্য সাময়িকীর প্রয়োজনীয়তা এখনো গভীরভাবে বিদ্যমান। সেই উপলব্ধি থেকেই ম্যাগাজিনের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে এই আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
উল্লেখ্য, ‘অআকথ’ বিগত তিন বছর ধরে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মননচর্চাভিত্তিক নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অমর একুশে বইমেলায় ভিন্নধর্মী স্টল হিসেবে এটি পাঠকদের দৃষ্টি কেড়েছে। পাশাপাশি ফেসবুক, ইউটিউব ও নিজস্ব ওয়েবসাইটে নিয়মিত সাহিত্যভিত্তিক কনটেন্ট প্রকাশ এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পাঠচক্র আয়োজনের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে সাহিত্যচর্চা চালিয়ে আসছে। এবার সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো একটি মুদ্রিত সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো ‘অআকথ’।