বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারী শ্রম দীর্ঘদিন ধরেই থেকে গেছে অদশ্য ও অবমূল্যায়িত। তবে নীরবে হলেও এক গভীর পরিবর্তনের সূচনা হচ্ছে। চা-বাগান, মৎস্যশ্রমিক সম্প্রদায়, গৃহস্থালি কাজ কিংবা ঘরে বসে পোশাক উৎপাদনের মতো অনানুষ্ঠানিক ও প্রান্তিক আনুষ্ঠানিক খাতগুলোতে কাজ করা নারী শ্রমিকরা এখন আর শুধু নীরব শ্রমিক নন-তারা সংগঠিত হচ্ছেন, নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে আওয়াজ তুলছেন।
এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহ-অর্থায়নে অক্সফ্যাম পরিচালিত এমপাওয়ারিং উইমেন থরু সিভিল সোসাইটি অ্যাক্টরস (EWCSA) প্রকল্প। প্রকল্পটির সমাপনী পর্ব উপলক্ষে ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় "FROM SHADOWS TO LEADERSHIP (ছায়া থেকে নেতৃত্বে)" শীর্ষক অনুষ্ঠান, যেখানে অনানুষ্ঠানিক ও প্রান্তিক আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের সংগ্রাম, অর্জন ও ভবিষ্যৎ পথচলার কথা উঠে আসে। আয়োজনটি দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে সংগঠিত নারী শ্রমিকরা নাগরিক সমাজ ও জবাবদিহিমূলক অংশীদারিত্বের সহায়তায় নীরবতাকে শক্তিতে এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনে রূপ দিতে পারেন।
অনুষ্ঠানে একটি ফটোস্টোরিবুক উন্মোচন করা হয়- যেখানে গৃহকর্ম, চা বাগান, মৎস্য এবং ঘরে বসে পোশাক উৎপাদন খাতে কর্মরত দশজন নারীর অনুপ্রেরণামূলক জীবনের গল্প তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে আলোচনায় বারবার জোর দেওয়া হয় যে- দরকষাকষির ক্ষমতা জোরদার করতে সংগঠন ও সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
প্রকল্পের প্রাথমিক তথ্যভিত্তিক ফলাফলে উঠে আসে চরম বঞ্চনার চিত্র। মাত্র ০.৭৩ শতাংশ নারীর কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছিল, ৮৫ শতাংশ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না এবং অধিকাংশই কখনো কোনো নাগরিক বা সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না।
পাঁচ বছরে ৩৩টি সংগঠনের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উডঈঝঅ স্থায়ী নেটওয়ার্ক, সমিতি এবং নেতৃত্ব বিকাশের পথ তৈরি করেছে। এটি সরাসরি ৪৫,০০০ নারীকে ক্ষমতায়িত করেছে এবং তাদের অধিকার আদায়, দরকষাকষি ও অ্যাডভোকেসির দক্ষতায় অর্জনে সহায়তা করেছে।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে সংগঠন ও সমন্বিত আন্দোলন। সংগঠনের মাধ্যমে নারী শ্রমিকরা এখন সম্মিলিতভাবে ন্যায্য মজুরি, কর্মস্থলের নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার দাবিতে আওয়াজ তুলছেন।
বরিশালের গৃহকর্মী পুতুল আক্তার তার জাগরণের কথা দৃঢ়ভাবে তুলে ধরে বলেন, 'এই প্রকল্পের আগে আমি নিজেকে কোনো পরিচয়েই চিনতাম না। অপমান আর অবহেলার মধ্যেই ছিলাম। এই প্রকল্পটি আমাকে নিজের পরিচয় চিনতে সাহায্য করেছে। এখন আমরা আইনি স্বীকৃতি বাস্তাবায়ন, চুক্তি এবং প্রতিটি শ্রমিকের প্রাপ্য মর্যাদা দাবি করছি।'
তিনি আরও বলেন, 'সংগঠনে যুক্ত হওয়ার পর আমি বুঝেছি-আমরাও শ্রমিক, আমাদেরও অধিকার আছে। কাজের বিনিময়ে সম্মান পাওয়ার অনুভূতিটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। ভবিষ্যতে আমরা চাই, গৃহকর্মীরা যেন অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত জরুরি কারণে ছুটি নিলে চাকরি হারাতে না হয়-এর জন্য আইনি স্বীকৃতির বাস্তবায়ন থাকা দরকার।' তার এই দাবি প্রতিফলিত হয়েছে ২০২৫ সালের সংশোধিত বাংলাদেশ শ্রম আইনে।
সিলেটের চা বাগানের শ্রমিক শিলা কুর্মি তার সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন কষ্ট ও আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 'আমরা ন্যায্য মজুরি, শ্রম আইনের বাস্তবায়ন, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা, সম্মানজনক কর্মপরিবেশ এবং শিক্ষা চাই-অনুগ্রহ হিসেবে নয়, অধিকার হিসেবে।'
নিজের অভিজ্ঞতার কথা টেনে তিনি বলেন, 'আমি নিজেও বাল্যবিবাহের শিকার ছিলাম। আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে পৌঁছাতে আমাকে অসীম সংগ্রাম করতে হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা বুঝেছি-নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা থেকেই পরিবর্তনের শক্তি তৈরি হয়। প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টির মধ্যে চা বাগানে কাজ করি। ২৩ কেজি চা পাতা তুলেও আমরা মাত্র ১৭৬ টাকা পাই। এই আয়ে সন্তানের স্কুল ফি, চিকিৎসা বা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বহন করা অসম্ভব।'
তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানান, 'আমাদের দাবি খুবই সাধারণ-মজুরি বাড়াতে হবে, উন্নত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এবং চা বাগানের স্কুলগুলোকে সরকারি স্কুল হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। তবেই আমাদের মেয়েরা শিক্ষার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারবে।'
মৎস্য ও ঘরে বসে পোশাক উৎপাদন খাতেও সংগঠনের মাধ্যমে নারী শ্রমিকরা পরিচয়পত্র, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং আনুষ্ঠানিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন।
বিলস (BILS)-এর নির্বাহী পরিচালক এবং শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বৃহত্তর সংহতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বলেন, 'এই চারটি খাতের নারী শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা খুবই সীমিত। এ অবস্থায় আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য সংগঠন ও আন্দোলন-দুটোই প্রয়োজন।'
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার ভিডিওবার্তায় কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, 'চা বাগানের শ্রমিক, জেলে, গৃহকর্মী এবং ঘরে বসে পোশাকশিল্পের শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক। তাদের অবদানকে পরিচয় ও নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। একই সঙ্গে জনমানসিকতার পরিবর্তন এবং গণমাধ্যমের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে, যাতে অধিকার কাগজে নয়-বাস্তবে কার্যকর হয়।'
বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধি দলের উন্নয়ন সহযোগিতা প্রধান মিখাল ক্রেইজা অগ্রগতি স্বীকার করে টেকসই পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে বলেন, 'EWCSA প্রকল্পের নারীরা অসাধারণ প্রভাব সৃষ্টি করছেন। এটি নারীদের বাস্তব পরিবর্তনের পথে এগিয়ে দিয়েছে। নারী শ্রমিকদের অগ্রগতি স্পষ্ট, তবে এই অগ্রগতি টেকসই করতে হলে শক্তিশালী আইন প্রয়োগ, বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা এবং নারী নেতৃত্বকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হবে।'
ইইউ ডেলিগেশনের (প্রোগ্রাম ম্যানেজার) কর্মসূচি ব্যবস্থাপক লায়লা জেসমিন বানু ধারাবাহিক সহায়তার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, 'নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর সক্ষমতা জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-যাতে এই অর্জনগুলো এগিয়ে নেওয়া যায় এবং নারীদের সমন্বিত দাবী নীতিনির্ধারণে স্থায়ীভাবে প্রতিফলিত হতে থাকে।'
অক্সফ্যামের কান্ট্রি ডিরেক্টর আশীষ দামলে বৃহত্তর জাগরণের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'মানুষ যখন জেগে ওঠে, তখন বলার মতো অনেক কিছু থাকে, আর করার মতো আরও বেশি। আমরা এখন সম্ভাবনার এক পর্যায়ে আছি, যেখান থেকে সচেতনতা ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে শ্রমিকদের আত্মনির্ভর ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে হবে।'
অনুষ্ঠানে সর্বসম্মতভাবে শ্রম আইন বাস্তবায়ন, পরিচয় ও সামাজিক সুরক্ষার আওতা সম্প্রসারণ এবং টেকসই নেতৃত্বের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে নারীদের সংগঠনগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
অর্জন সত্ত্বেও-লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, বাস্তবায়নের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি প্রভৃতি ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। যৌথ দরকষাকষির মাধ্যমে টেকসই ঐক্যই সামনে এগোনোর পথ।
EWCSA প্রমাণ করেছে, নারীরা বিচ্ছিন্ন অবস্থা থেকে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে পৌঁছেছে, যা প্রমাণ করে-ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী পরিবর্তন অর্জনে সম্মিলিত শক্তি অপরিহার্য।