সর্বব্যাপী সাংস্কৃতিক সংকট থেকে উত্তরণে আগের বছরের দেচেয়ে চর্চা বাড়লেও সামাজিক মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক কোনো প্রভাবে ফেলতে পারেনি। চিরন্তন বাঙালি সংস্কৃতির বদলে বিপথগামিতা বেড়েছে। জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ে মঞ্চ, সংগীত, নাটকচর্চায় কিছুটা গতি এলেও বাড়েনি সামাজিক মনোযোগ। উলটো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বাধা এসেছে দফায় দফায়।
২০২৫ সাল জুড়েই বিভিন্ন জেলায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড-বিশেষ করে লোকজ গান, মঞ্চনাটক, বাউল, পালাগান ও আধুনিক ব্যান্ড সংগীত নানা ধরনের বাধা, হস্তক্ষেপ ও হামলার মুখে পড়েছে।
খোদ রাজধানীতে বছরের বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি মঞ্চনাটকের প্রদর্শনী বাতিল বা সীমিত করা হয়। আয়োজকদের অনেকের ভাষ্য, সম্ভাব্য আপত্তি ও চাপের আশঙ্কায় নিজেরাই অনুষ্ঠান প্রত্যাহার করেছেন। তবে সবচেয়ে বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ভবনে।
গত ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতের পর একদল বিক্ষোভকারী ধানমণ্ডির সাততলা এ ভবনের বিভিন্ন তলায় গিয়ে প্রতিটি কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। যা দেশে-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। নানা সংগঠন ও নাগরিক সমাজ প্রবল প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। এর এক দিন পরেই হামলা হয় উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়। যা নিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এখনো ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বাউল গানে বাধা দেওয়ার ঘটনা ছিল বছর জুড়েই। প্রথমে বছরের শুরুর মাস জানুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বাউলগানের আসর মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া হয়। লিখিত নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই একতারা, দোতারা, খোলসহ বাদ্যযন্ত্র জব্দ করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে প্রয়াত বাউলশিল্পী রশিদ সরকারের স্মরণে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী 'সাধুর মেলা' স্থানীয়দের বাধার মুখে পণ্ড হয়ে যায়। আবার বছরের শেষের দিকে নভেম্বরে বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেফতার করা হয়। যা নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়।
কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় কিছু গানের আসরের অনুমতি বাতিল করা হয়। কোথাও মাঝপথে মাইক বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বছরের শেষ দিকে নভেম্বরে খুলনায় বাউল শিল্পীদের একটি সমাবেশে হামলার ঘটনায় কয়েক জন শিল্পী আহত হন। মঞ্চ ও বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর করা হয়। এসব ঘটনার জেরে স্থানীয়ভাবে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক আয়োজন স্থগিত হয়ে যায়। একইভাবে ঠাকুরগাঁও জেলাতেও বাউল ও লোকসংগীত শিল্পীদের একটি অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়া হয়। আয়োজকদের অভিযোগ, নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা জানিয়ে অনুষ্ঠান না করার 'পরামর্শ' দেওয়া হয়েছিল।
গত ২৬ নভেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ে আদালত প্রাঙ্গণে কয়েকজন বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীর ওপর আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত
চার জন আহত হন। সর্বশেষ গত ২৬ ডিসেম্বর ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫ বছর উদ্যাপন ও পুনর্মিলনীর শেষ দিনে বহিরাগতদের হামলায় জেমসের (নগরবাউল) বহুল প্রত্যাশিত কনসার্ট পণ্ড হয়ে যায়। অনুষ্ঠানস্থলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে আয়োজকেরা নিরাপত্তাজনিত কারণে অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য হন।
বছর জুড়ে সবচেয়ে বেশি বাধার মুখে পড়ে বাউল ও আধ্যাত্মিক সংগীত, জারি, পালাগান ও যাত্রা, মঞ্চনাটক ও সামাজিক বক্তব্যধর্মী শিল্প। যে তালিকায় উঠে আসে জনপ্রিয় ব্যান্ড সংগীতও। তবে এসব ভয় আর শঙ্কার মধ্যেই শিল্পকলা একাডেমি দেশ জুড়ে তিন ডজনের বেশি নতুন নাটক এনেছে মঞ্চে। এছাড়া আরণ্যক নাট্যদল, এপিক থিয়েটার, নাট্যকেন্দ্র, নাট্যদল দৃশ্যপট, প্রাচ্যনাট, তাড়ুয়া, থিয়েটার ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন নাট্যদল নতুন নাটক উপহার দিয়েছে। অনেক নতুন সংগঠনও এগিয়ে এসেছে নাটক নিয়ে। অবশ্য, নাট্যমঞ্চে আলো ফিরলেও দর্শক সাড়া মিলেছে খুব কম। নাট্য ব্যক্তিত্বরা বলছেন, মঞ্চে আলো জ্বলেছে, নতুন মুখ এসেছে। তবে দর্শক এসেছে খুবই কম।
এদিকে, বছরের মাঝামাঝিতে গত ২২ জুলাই দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদের উদ্যোগে ঢাকার মগবাজারে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক দায়িত্বশীল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে সারা দেশ থেকে প্রায় ৯০টি সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের ২৬০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। হামদ, নাত, দেশাত্মবোধক ও আঞ্চলিক গান পরিবেশন হয়। তাছাড়া দীর্ঘ প্রায় দুই দশক বন্ধ থাকার পর গেল আগস্টে বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায় শিশু শিল্পীদের প্রাণচাঞ্চল্য ছড়িয়ে ফিরেছে রিয়েলিটি শো নতুন কুঁড়ি। ফলে শিশু-কিশোর ও অভিভাবকদের মধ্যে সাড়া পড়ে। বিজয়ের মাস উপলক্ষ্যে গত ২৪ ডিসেম্বর থেকে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে চার দিনব্যাপী 'প্রাণে আনো গান' শীর্ষক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করা হয়। সংগীত, আবৃত্তি, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড চলে। শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগেও নানা আয়োজনের পাশাপাশি ড্রোন উৎসব, চাঁদ রাতের আয়োজন, প্রবারণা পূর্ণিমা উদ্যাপনসহ ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক আয়োজন বেশ সাড়া ফেলেছে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা বলছেন, শেকড়ের সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিত অনেক মঞ্চে বিজাতীয় সংস্কৃতির ধারক-বাহকদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। তৃণমূলে বা প্রান্তিকের জারি, সারি পালাগানের ওপর আঘাত এসেছে। এসব বাধার ঘটনা তৃণমূলে নাট্য দলগুলোর মঞ্চে ফেরার উদ্যমকে অনিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি সংগীত উৎসব, মঞ্চ বা শেকড়ের সংস্কৃতি চর্চাও ভয় আর শঙ্কা গিলে ফেলেছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় বাজেটের ১ শতাংশ সাংস্কৃতিক খাতে বরাদ্দের যে দাবি তা এবারও পূরণ হয়নি। ফলে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চায় রাষ্ট্রীয় সহায়তার চিত্রও হতাশা বাড়িয়েছে।
জানতে চাইলে বিশিষ্ট কবি ও গীতিকার শহীদুল্লাহ ফরায়জী ইত্তেফাককে বলেন, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা খুবই ন্যক্করজনক। যা মেনে নেওয়া যায় না। সহিংসতা বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে কখনো যায় না। যারা এসব হামলা ঘটিয়েছে তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার। আগামীতে যেন এমন হামলার ঘটনা না ঘটে। আমরা সব সময়ই আশাবাদী। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে নতুন সরকার আসবে। যারা এসব সহিংসতা বন্ধ করবে বলে প্রত্যাশা করি।
একই কথার প্রতিধ্বনি হলো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠেও।
তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানসহ স্থাপনার ওপর হামলা মানে বাঙালির জাতিসত্তার ওপর হামলা। আমরা এই হামলার সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে বিচার চাই। তিনি বলেন, ছায়ানটের মতো একটা বৃহৎ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান, যেটা কিংবদন্তি। সেই কিংবদন্তি স্থাপনার ওপর হামলা মেনে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা, মুক্তিযোদ্ধা, অভ্যুত্থান সবকিছুতে সংস্কৃতিতে এই গান অগ্রভাগে ছিল, আছেই। যুগ যুগ ধরে গান শুনিয়ে দেশপ্রেমিক মানুষকে সাহস ও অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে এমন একটা ঘটনা কীভাবে ঘটাল, এটা আমরা মেনে নিতে পারি না।