দেশের উচ্চশিক্ষায় গুণগত মান, বৈশ্বিক কারিকুলাম ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার কথা উঠলেই বারবার সামনে আসে দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির নাম। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি শুধু ডিগ্রিধারী গ্র্যাজুয়েট নয়, বরং মানবিক ও নৈতিক গুণাবলীসম্পন্ন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বর্তমান অবস্থান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে ভাবনার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হান্নান চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার।
বিশ্বমানের কারিকুলাম
পয়ত্রিশ বছরের যাত্রায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি দেশসেরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে। ‘দেশসেরা’ অভিধাটি কোনো আত্মপ্রচার নয়; বরং গবেষক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত মূল্যায়নের ফল। জন্মলগ্ন থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বমানের কারিকুলাম অনুসরণ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় অ্যাট আরবানা-শ্যাম্পেইনের আদলে তৈরি পাঠক্রম নর্থ সাউথকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভিন্নমাত্রায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
একইসঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হয়েছে। উন্নত বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী শিক্ষকরা এখানে পাঠদান করছেন, যা শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত মান নিশ্চিত করেছে। এর ফল হিসেবে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি বিভিন্ন অ্যাক্রিডিটেশন ও র্যাংকিংয়ের গ্রেডিংয়ে দেশের শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বয়স ও ক্যাম্পাসের পরিসরের কারণে কিছু কিছু র্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকলেও, গুণগত মানে নর্থ সাউথ অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রসর।
দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন
মানবসম্পদ উন্নয়নকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে। এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি ৪৭ হাজার ৫০০ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করেছে। আসন্ন সমাবর্তনের মাধ্যমে আরও সাড়ে তিন হাজার গ্র্যাজুয়েট যুক্ত হবেন এই তালিকায়। ফলে মোট গ্র্যাজুয়েট সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এই গ্র্যাজুয়েটরা দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন খাতে যেমন অবদান রাখছেন, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চ বেতনে কাজ করে আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
মানবিকতা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের মান শুধু অবকাঠামো দিয়ে বিচার করা যায় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানবসম্পদ। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি সার্টিফিকেট-নির্ভর শিক্ষায় বিশ্বাস করে না। এখানে শিক্ষার্থীদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা—এই তিনটি বিষয়কে শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়টি সমাজে কী ধরনের প্রভাব রাখছে। ফলে দেখে থাকবেন, নর্থ সাউথের গ্র্যাজুয়েটরা যেখানেই কাজ করছে—তারা ভালো করছে।
নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার, গবেষণা ও উদ্ভাবনে জোর
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি স্থানীয় ও বৈশ্বিক অংশীজনদের একত্র করে নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্বাস্থ্য, প্রকৌশল, সামাজিক সমস্যা সমাধান—বিভিন্ন খাতে গবেষণার কাজ চলছে। এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে স্বনামধন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা চুক্তি রয়েছে। তাদের সঙ্গে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ফলে নর্থ সাউথেও বিশ্বমানের গবেষণার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি নর্থ সাউথ ক্যাম্পাসে গুগল একটি সাইবার সিকিউরিটি ল্যাব স্থাপনে কাজ শুরু করেছে।
এছাড়া সরকারের সহায়তায় ইনোভেশন হাব ও ফ্যাব ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি ইন্টেলিজেন্স মেশিন ল্যাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং ও ডিপ লার্নিং নিয়ে কাজ করছেন বিশ্বমানের গবেষকরা। বিশ্বসেরা জার্নালে তারা নিজেদের গবেষণা প্রকাশ করছেন। রোবটিক্স নিয়ে কাজ করছে নর্থ সাউথের ‘নিরো’ উইং। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সর্বাধিক সংখ্যক অ্যাকাডেমিক প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে নর্থ সাউথে। কয়েকটি নামীদামী চায়নিজ কোম্পানিও বিভিন্ন কারিগরি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নর্থ সাউথের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।
নতুন ক্যাম্পাসের পরিকল্পনা
বর্তমান ক্যাম্পাসে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য যথেষ্ট সুবিধাদি নিয়ে চারটি ফ্যাকাল্টির অধীনে ১৮টি ডিপার্টমেন্টে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম চলছে। বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য এবং প্রকৌশলের বিভিন্ন বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে। তবে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। ঢাকার অদূরে নতুন করে ৩০০ বিঘা জমিতে আরেকটি ক্যাম্পাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা থাকবে। ফ্যাকাল্টির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
সবুজ পরিসরে বিন্যস্ত ক্যাম্পাসটি হবে আধুনিক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব, যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত থেকে মুক্তমনস্ক হয়ে গড়ে উঠবে। এছাড়া সরাসরি মাল্টি-সেক্টরাল ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে, যা গ্র্যাজুয়েশনের সঙ্গেসঙ্গে তাদের চাকরির ব্যবস্থা করবে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ তৈরির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু চিকিৎসাবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়—যেমন মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফার্মেসি, পাবলিক হেলথ ইত্যাদি পড়ানো হয়, তাই তা চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ানোর ক্ষেত্রে ভিন্নমাত্রা তৈরি করতে পারে।
ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট নয়, দক্ষতাই ভবিষ্যৎ
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি সার্টিফিকেট-অরিয়েন্টেড পড়াশোনায় বিশ্বাসী নয়। স্রেফ ডিগ্রি প্রদান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা চাই, ছাত্রছাত্রীরা যখন ক্যাম্পাসে থাকবে তখন তারা সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস সম্পর্কে জানবে এবং বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি সম্যক নানা বিষয়ে ধারণা রেখে প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জন করবে। অথচ দেশের উচ্চশিক্ষায় এখনো সার্টিফিকেট-নির্ভর পড়াশোনার প্রবণতা প্রবল। দক্ষতা ও প্রয়োগভিত্তিক জ্ঞানের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন না এলে আমরা পিছিয়ে যাব। তাই সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে, যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মমুখী শিক্ষা প্রদান ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করা উচিত। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি খুব শিগগিরই বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে একটি সুপরিচিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে জায়গা করে নেবে বলে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলে প্রত্যাশা করেন—যেখানে বরাবরের মতো ডিগ্রির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে দক্ষতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা।