নগদ মূলধনবিহীন আত্মকর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ

স্থানীয় ডিলারদের ঋণে মুরগির খামার করে অতীতে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিরা এখন চুক্তিভিত্তিক ব্রয়লার খামারে ফিরে এসেছেন। এ ধারায় যুক্ত হয়েছেন শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত বেকার তরুণরা, পাশাপাশি বয়স্ক ব্যক্তিরাও। ব্যবসা করার জন্য যাদের নগদ টাকা ছিল না, তারাও মূলধনবিহীন চুক্তিভিত্তিক ব্রয়লার খামারে সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন। এসব তথ্য দক্ষিণাঞ্চলের দুই জেলা—বরিশাল ও ঝালকাঠির পোল্ট্রি খামারিদের কাছ থেকে জানা গেছে।

খামারিরা বলেন, চুক্তিভিত্তিক ব্রয়লার চাষের ব্যবস্থা ঝুঁকি ছাড়াই মুরগি পালন করে লাভবান হওয়ার সুযোগ দেয়। ডিলারের ঋণে করা খামারে রোগের প্রাদুর্ভাব বা মুরগির দাম কম থাকলে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। চুক্তিভিত্তিক খামার ব্যবসা খামারি ও কোম্পানির মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর হস্তক্ষেপ বন্ধ করে। একদিনের মুরগির বাচ্চা, খাবারসহ অন্যান্য সুবিধা কোম্পানি সরাসরি সরবরাহ নিশ্চিত করে। ফলে মুরগির উৎপাদন খরচ কমে এবং ভোক্তাদের জন্যও সহজলভ্য হয়।

এই খামার ব্যবসার বিরোধিতা করেছেন কিছু মাত্রাতিরিক্ত মুনাফাকারী ডিলার, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কোম্পানীর মুরগির বাচ্চা ও খামার বিক্রির আড়ালে খামারিদের ঋণের ফাঁদে ফেলে আসছিল। সচেতন উদ্যোক্তারা ডিলারের ফাঁদ থেকে বের হয়ে সরাসরি কোম্পানির সঙ্গে খামার করছেন। ফলে কিছু চিহ্নিত ডিলার কোম্পানির বিপক্ষে নেমেছেন।

জেলার এয়ারপোর্ট রোডের কলাডোমার ফোরকান হোসেন (২৬) জানান, ডিলারের সঙ্গে দুই বছর মুরগির খামার করে তিনি চার লাখ টাকা লোকসান করেছিলেন। এরপর সমিতির ঋণে ডিলারের দায়-দেনা মিটিয়ে কাজী ফার্মসের চুক্তিভিত্তিক ব্রয়লার ফার্ম (সিবিএফ) এ যুক্ত হয়েছেন। ২,০০০ মুরগির খামার পরিচালনা করে গত ১৪ মাসে একবারও লোকসানের মুখোমুখি হননি। প্রতি ব্যাচে সর্বনিম্ন ৪৫,০০০ এবং সর্বোচ্চ ৮৬,০০০ টাকা আয় করেছেন। খরচ বাদ দিয়ে লাভ হয়েছে চার লাখ টাকারও বেশি।

ফোরকান বলেন, “কিছু ডিলারের ভূমিকা ‘রক্ত চোষা’র চেয়ে খারাপ। তারা খামারিদের পদে পদে শোষণ করে। নিজেদের মুনাফা তুলতে গিয়ে খামারিদের দেউলিয়া করে দেয়।”

জেলার বাবুগঞ্জের মানিক কাঠির ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়র মো. শাওন হোসেন (২৩) চাকরির পরিবর্তে কাজী ফার্মসের সিবিএফ শুরু করেছিলেন ৮০০ মুরগি দিয়ে। এখন দুই শেডে তার ২,২০০ মুরগি রয়েছে। পূর্বে ডিলারের সঙ্গে খামারের ব্যবসায় লোকসান করা শেড নিকটাত্মীয়ের ৫ বছরের চুক্তিতে ভাড়া নেওয়া শাওনের প্রতি ব্যাচে আয় ৫০,০০০–৬০,০০০ টাকা। খামারের আকার বাড়াতে তিনি বন্ধু হাসানকেও সঙ্গে নিয়েছেন। নতুন বছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩,০০০ মুরগির খামার চালু করবেন।

শাওন বলেন, “পারিবারিক চাহিদা মেটাতে চাকরির বদলে খামারের পরিকল্পনা থাকলেও লাখ টাকার পুঁজি না থাকায় ডিলারের সঙ্গে ব্যবসার সুযোগ পাইনি। তবে সিবিএফ এর কারণে স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। সহায়-সম্বলহীন মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় সুযোগ আর নেই।”

দক্ষিণাঞ্চলের অপর জেলা ঝালকাঠির শিবাইকাঠির খামারি মো. মাহবুবুল হক (৬১) জানান, বিভিন্ন জেলায় ব্যবসা ও চারি শেষে নিজ গ্রামে ফিরে তিন বছর আগে তিন হাজারের শেডে সিবিএফের আওতায় ২,৭০০ মুরগি পালন করছেন। তিনি বলেন, “এই বয়সে কেউ চাকরি দেবে না জানায় কাজী ফার্মসের সঙ্গে খামার করে চাকরির চেয়ে অনেক বেশি আয় করছি। সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে। বাড়িতে বসে খামার করে মাসে গড়ে লাখ টাকা ব্যাংক একাউন্টে জমা হচ্ছে। এলাকার অনেকে সিবিএফ খামার শুরু করেছে এবং ভালো করছে। শিক্ষিত বেকাররাও এতে যুক্ত হচ্ছে।”

জেলার গৌরনদীর টরকি বন্দর এলাকার পোল্ট্রি ডিলার আব্দুল কাদের শামীম (৩৮) বলেন, “ডিলারের সঙ্গে খামার করলে উদ্যোক্তারা তেমন সুবিধা পান না। আমাদের কাছ থেকে খামারিরা যত রকম পণ্য কিনে, আমরা লাভ করি। মুরগি বিক্রির সময়ও খরচের জন্য একটি অংশ খামারি থেকে নিতে হয়। কোম্পানি একদিনেই খামার থেকে সব মুরগি সংগ্রহ করে দুই-তিন দিনের মধ্যে কমিশন খামারির ব্যাংকে পৌঁছে দেয়। তবে সিবিএফ করতে হলে পরিকল্পিত শেড, ভালো পরিবেশ ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা জরুরি। যে কেউ চাইলেই কোম্পানির সিবিএফ-এ যুক্ত হতে পারে না।”

পোল্ট্রি পণ্যের সাত বছরের ডিলার মো. হামিম (২৮) বলেন, “দক্ষিণাঞ্চলে গত কয়েক বছরে পোল্ট্রি খামারে বড় পরিবর্তন এসেছে। মূল কারণ চুক্তিভিত্তিক ব্রয়লার খামার (সিবিএফ)। এতে খামারিদের শেড ছাড়া কোনো পুঁজি লাগে না। লোকসানের ভয় নেই। বাচ্চা, ফিড, ওষুধ, চিকিৎসা—সবই কোম্পানি সরাসরি খামারের দ্বার পৌঁছে দেয়। মুরগি বিক্রির দায়িত্বও নেয়। উৎপাদন খরচ কমে এবং কমিশন সরাসরি খামারির ব্যাংক একাউন্টে যায়। অতীতের ডিলারের সঙ্গে ব্যবসা করা খামারি অনেকেই সিবিএফ-এ এসেছে।”

প্রায় একই মতামত ব্যক্ত করেছেন জেলার পাইকারী মুরগি ক্রেতা-বিক্রেতা উজিরপুরের শিপলু বাড়ই (৩০)। তিনি বলেন, “ডিলার ও সিবিএফ থেকে কিনে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করা সহজ হয়েছে। সিবিএফ এর মুরগি মান ভালো হওয়ায় কেনা-বিক্রির মধ্যে ওয়েট লস কম হয়েছে। আগে বরিশালের বাজারের চাহিদা মেটাতে অন্য জেলায় ঘুরে মুরগি আনতে হতো, এখন আর তা করতে হয় না। সিবিএফ উদ্যোক্তা ও মুরগি ব্যবসায়ীদের জন্য আশীর্বাদ।”