ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনীতে এবার রেকর্ড সংখ্যক ভোটার। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, জেলায় মোট ভোটার ১৩ লাখ ৩০ হাজার ৯২৪ জন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটার ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫০ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল তরুণ ভোটারগোষ্ঠীই ২০২৬ সালে ফেনীর তিনটি সংসদীয় আসনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যানুযায়ী, মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬৭ জন, নারী ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৪৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৮ জন। এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলায় ভোটার ছিল ১২ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৫ জন। এবার প্রায় এক লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ায় ফেনীর ভোটের সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
জানা যায়, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পৈত্রিক ভূমি হওয়ায় ফেনীতে ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির শক্ত অবস্থান রয়েছে। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে এমন চিত্রই পাওয়া যায়। ২০০১ সাল থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত জামায়াত-বিএনপি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করেছে। ফলে এবার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাদের ভোটব্যাংকের হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এ ক্ষেত্রে নতুন ও তরুণ ভোটাররাই হয়ে উঠতে পারেন ফলাফল নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক।
জেলায় মোট ভোটারের ৪৪ দশমিক ৬০ শতাংশই ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী। এদের একটি অংশ ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিলেও পরবর্তী সময়ে কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন না হওয়ায় ভোটের ফলাফলে তাদের প্রভাব তেমনভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
নতুন ভোটার, নির্বাচন বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তরুণ ভোটারদের মধ্যে রয়েছে ‘জুলাই আন্দোলনের’ স্পিরিট। নির্দিষ্ট কোনো দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে তরুণদের বড় অংশই এবার ‘ব্যক্তি’ ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে ভোট দিতে পারে। অর্থাৎ, কারা আগামী জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা নির্ধারণে তরুণ ভোটাররাই মুখ্য ভূমিকা রাখবেন।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলেও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আলাদা জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নিজেদের পক্ষে টানতে একাধিক প্রার্থীর তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ফেনীর তিনটি আসনেই বিএনপির প্রার্থী থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট থেকে ফেনী সদর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। আসনটি বিএনপির ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত হলেও নতুন ভোটার ও জুলাই স্পিরিটের কারণে তিনি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন।
অন্যদিকে, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জয়নাল আবেদিন (ভিপি জয়নাল) দলীয় ভোটব্যাংকের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের কারণে এলাকায় আলোচিত। এ আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণঅধিকার পরিষদের প্রতীকে জনতার অধিকার পার্টির (পিআরপি) চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম ভূঞা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. একরামুল হক ভূঞাসহ মোট নয়জন প্রার্থী।
ফেনী-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রফিকুল আলম মজনুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিন। ফেনী-৩ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও দলীয় প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. ফখরুদ্দিন মানিক শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
নির্বাচন অফিসের বয়সভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ১৮–২১ বছর বয়সী ভোটার ৭৯ হাজার ৮৮২ জন, ২২–২৫ বছর বয়সী ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৩৪ জন, ২৬–২৯ বছর বয়সী ১ লাখ ৩০ হাজার ৮৬৮ জন, ৩০–৩৩ বছর বয়সী ১ লাখ ১৬ হাজার ৮০১ জন এবং ৩৪–৩৭ বছর বয়সী ভোটার ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৫ জন।
এই ভোটারদের বড় অংশের জন্ম ১৯৯০ সালের পর। ফলে তারা বাংলাদেশের ইতিহাসে কার্যকর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচন খুব একটা দেখেনি। ২০১৪ সালের বিনা ভোটের নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের ‘ডামি’ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হওয়া এই প্রজন্মের কাছে ভোটাধিকার এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
জাতীয় নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আলাদাভাবে নির্বাচন করেছিল। সে সময় ফেনীতে জামায়াতের গড় ভোট ছিল ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ, আর বিএনপির গড় ভোট ছিল ৪৪ দশমিক ০৯ শতাংশ। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভোটার কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে এবারের নির্বাচনে এই হিসাব ভিন্ন হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জেলার বিশাল তরুণ ভোটারগোষ্ঠীই এখন রাজনীতির প্রধান শক্তি। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ ও সচেতন এই প্রজন্ম যেদিকে ঝুঁকবে, ফলাফলও সেদিকেই যাবে। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই তরুণদের প্রভাব স্পষ্ট। বিশেষ করে নতুন ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ফেনী-১ আসনের তরুণ ভোটার সায়েম উল্ল্যাহ বলেন, “আমরা শুধু জয়–পরাজয়ের গল্প শুনেছি, নিজের চোখে সুষ্ঠু নির্বাচন দেখিনি। ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে সেটাকে গুরুত্ব দিয়েই নেব।”
ফেনী সদর উপজেলার ২৬ বছর বয়সী প্রথমবারের ভোটার আরিফ হোসেন বলেন, “শুধু পোস্টার–ব্যানার দেখে ভোট দিতে চাই না। ভোটটা যেন সত্যিই দেওয়ার মতো হয়, সেটাই আমাদের চাওয়া।”
শেখ মুন্না বলেন, “এ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থীকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ায় তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এখানে তরুণরাই বড় ফ্যাক্টর। তারা যাকে ভোট দেবে, সেই বিজয়ী হবে।”
দাগনভূঞার ৩২ বছর বয়সী ভোটার নুসরাত জাহান বলেন, “আমাদের প্রজন্ম কখনো সঠিক ভোটের পরিবেশ দেখেনি। এবার সুযোগ এলে আমরা নিজের সিদ্ধান্তেই ভোট দিতে চাই। সরকার পতনের পর যে দল তরুণদের মনোভাব বুঝে রাজনীতি করবে, ভোট তার ব্যালটেই যাবে।”