জানুয়ারির শীতল রাতগুলোতে ঘুম আসে না হাসান আলির। চোখ বন্ধ করলেই তার সামনে ভেসে ওঠে একটাই দৃশ্য—৫৮ বছর বয়সী বাবা তাহের আলি, অচেনা সীমান্তের ধুলো–বালির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন, জানেন না সামনে কোন দেশ, পেছনে কোথায় ফেরার জায়গা। মোবাইল ফোনের ওপাশে বাবার কণ্ঠে ভরসা নেই, শুধু একটাই অনুরোধ—‘আমাকে এখান থেকে বের করো।’
গত আট মাসে তিনবার তাহের আলিকে ভারত থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ তাকে নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করেনি। ফলে প্রতিবারই তিনি ফিরেছেন—আর আবারও তাকে জোর করে সীমান্তে পাঠানো হয়েছে। এই দোলাচলে পড়ে তিনি এখন কার্যত রাষ্ট্রহীন, দুই দেশের মাঝখানে আটকে থাকা এক মানুষ।
তাহের আলিকে ‘ঘোষিত বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল। যদিও তিনি সারাজীবন আসামেই বসবাস করেছেন। ২০০৯ সালে নগাঁও জেলার একটি ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে একতরফা (এক্স–পার্টে) রায় দেয়, যেখানে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এই ধরনের আধা–বিচারিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আসামে হাজারো মানুষ নাগরিকত্ব হারিয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও তাহের আলির ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তাকে তেজপুর ডিটেনশন সেন্টারে চার বছর আটক রাখা হয়। মুক্তির পর তিনি নিজ গ্রামেই ছিলেন।
কিন্তু গত মে মাসে পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার পর আসামে ‘ঘোষিত বিদেশিদের’ বিরুদ্ধে অভিযানের সময় পুলিশ তাকে আবার তুলে নেয়। এরপর মাতিয়া ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে তাকে অস্ত্রের মুখে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়।
হাসান আলির ভাষ্য অনুযায়ী, সেই প্রথম ‘পুশ–ব্যাক’-এর পর বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড তাকে ঢুকতে দেয়নি। তাকে ফেরত এনে কোকরাঝাড় হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়। পরিবার তখন কিছুটা স্বস্তি পেলেও আইনি লড়াইয়ের সুযোগ আর পাওয়া যায়নি।
সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের এক হলফনামা অনুযায়ী, সেই সময় ১০৯ জন ঘোষিত বিদেশিকে একযোগে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়।
হাসান আলি জানান, মে মাসে তার বাবা ফোন করে জানান, তাকে অস্ত্রের মুখে বাংলাদেশে ঢুকতে বাধ্য করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড তাকে ঢুকতে দেয়নি। ফলে তাকে আবার ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে এনে কোকরাঝাড় হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়। বিষয়টি গৌহাটি হাইকোর্টে দাখিল করা বিএসএফের হলফনামাতেও উল্লেখ রয়েছে।
পরদিনই কোকরাঝাড় হোল্ডিং সেন্টার থেকে তাহের আলিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। হাসান আলির দাবি, তাকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরের শ্রীভূমি জেলায় নিয়ে গিয়ে ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। ছয় দিন পর স্থানীয় গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা সাতজনকে ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকতে দেখে আটক করেন। তাদের মধ্যে তাহের আলিও ছিলেন। পরে তাদের বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি ঘটনা। ২৯ ডিসেম্বর তাহের আলি আবার ছেলেকে ফোন করেন। তিনি জানান, ২৮ ডিসেম্বর সকালে তাকে গাড়িতে করে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরের দক্ষিণ সালমারা–ধুবরি সীমান্তে নিয়ে গিয়ে তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। তিনি ছেলেকে অনুরোধ করেন তাকে উদ্ধার করতে।
হাসান আলি বলেন, ‘আমার বাবা পড়তে–লিখতে জানেন না। সেখানে তিনি কীভাবে থাকবেন? তিনি তো বাংলাদেশি নন। তিনি ভোটার, তার দাদার নাম ১৯৬৫ সালের ভোটার তালিকায় আছে। তার ১৩ ভাই–বোন সবাই ভারতীয়। তাহলে একা আমার বাবা কীভাবে বাংলাদেশি হন?’
তাহের আলি একা নন। একইভাবে গত আট মাসে তিনবার বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে নগাঁও জেলার রাহা এলাকার দিনমজুর ইদ্রিস আলিকেও। ২০১৬ সালে তাকেও ঘোষিত বিদেশি করা হয়। তিন বছর ডিটেনশন সেন্টারে থাকার পর মুক্তি পেলেও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তিনি ট্রাইব্যুনালের রায় চ্যালেঞ্জ করেননি।
মে মাসে রাজ্যব্যাপী অভিযানে তাকেও মাতিয়া ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্রথমবার বাংলাদেশে পাঠানো হলে তিনি গোপনে ফেরত আসেন। পরে আবার আটক হয়ে কোকরাঝাড় হোল্ডিং সেন্টারে যান। পরিবারের সদস্যরা তার মুক্তির চেষ্টা চালানোর মধ্যেই ডিসেম্বরের ১৭ তারিখে তার বিরুদ্ধেও বহিষ্কার আদেশ জারি হয়।
২৪ ডিসেম্বর শ্রীভূমি জেলায় গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর তোলা একটি ছবিতে ইদ্রিস আলিকে তাহের আলির পাশে দেখা যায়। কয়েক দিন পর বাংলাদেশে কুড়িগ্রাম জেলার একটি ভিডিওতে তাকে দেখা গেলে পরিবার নিশ্চিত হয়, তাকেও তৃতীয়বারের মতো সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। পরে বাংলাদেশ পুলিশ তাকে আটক করেছে বলে সেখানকার কর্মকর্তারা জানান।
আইনজীবী ও গবেষকদের মতে, আসাম সরকারের এই ‘পুশ–ব্যাক’ নীতি আন্তর্জাতিক আইন ও ভারতের সংবিধান—দুটোরই পরিপন্থী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অভিষেক সাহা বলেন, ‘এটি রাষ্ট্রহীনতা তৈরি করার প্রক্রিয়া। মানুষগুলোকে টেনিস বলের মতো দুই দেশের মধ্যে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।’
আইনজীবী উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি বলেন, কোনো ব্যক্তিকে বহিষ্কারের আগে তার নাগরিকত্ব যাচাই ও সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর বাধ্যতামূলক। কিন্তু এখানে তা করা হচ্ছে না।
আসাম সরকার এসব বহিষ্কারের যুক্তি হিসেবে ১৯৫০ সালের ‘ইমিগ্র্যান্টস (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) অ্যাক্ট’ ব্যবহার করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশভাগ–পরবর্তী ভিন্ন বাস্তবতায় প্রণীত এই আইন বর্তমান প্রেক্ষাপটে এভাবে প্রয়োগ করা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।