ঘন কুয়াশা থেকে ফসল বাঁচাতে ‘পলিথিন থেরাপি’

দেশের শীতকালীন সবজি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান এলাকা পাবনার ঈশ্বরদীতে তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে কৃষি খাতে সংকট দেখা দিয়েছে। টানা দুই সপ্তাহ ধরে জেঁকে বসা মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শীতকালীন সবজি ও বোরো ধানের বীজতলা। এতে থমকে গেছে চারাগাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি। এমন পরিস্থিতিতে ফসল বাঁচাতে কৃষকরা উদ্ভাবনী কৌশল হিসেবে ‘পলিথিন থেরাপি’র আশ্রয় নিচ্ছেন।

কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় কৃষকদের সূত্রে জানা গেছে, তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলেই চারাগাছ ও বীজতলায় ক্ষতির আশঙ্কা শুরু হয়। অথচ গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে টানা প্রায় ১৫ দিন ধরে ঈশ্বরদীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ থেকে ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। ক্রমাগত ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের কারণে মাঠে রোপণ করা কচি চারা ও ধানের বীজতলা লালচে হয়ে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এলাকার মাঠ ঘুরে দেখা যায়, শীত থেকে চারা রক্ষায় কৃষকরা লাউসহ বিভিন্ন সবজির প্রতিটি চারা আলাদাভাবে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রেখেছেন। কৃষকদের ভাষ্য, এতে উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়লেও চারাগাছ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকছে।

কৃষকরা জানান, শিশির ও অতিরিক্ত ঠান্ডা সরাসরি চারায় লাগলে পচন ধরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। পলিথিন ব্যবহারে সেই ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাচ্ছে। ইস্তা গ্রামের কৃষক আদম আলী বলেন, ‘শীতের কারণে বীজতলা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কৃষি অফিসের পরামর্শে পলিথিন কিনে বীজতলা ঢেকে রেখেছি। এতে খরচ বাড়লেও চারা রক্ষা করা যাচ্ছে।’ তবে বাড়তি খরচ সামলাতে অনেক কৃষক হিমশিম খাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

উমিরপুর গ্রামের প্রান্তিক কৃষক জয়নাল প্রামাণিক বলেন, ‘আমার দুই বিঘা জমির লাউগাছের প্রতিটি চারা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিয়েছি। এতে কুয়াশা সরাসরি চারার ওপর পড়ছে না। পাশাপাশি ভেতরে জমে থাকা বাষ্পের পানি গাছের গোড়ায় সেচের কাজ করছে।’

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুজন রায় জানান, ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীত থেকে বোরো ধানের বীজতলা ও শাকসবজি রক্ষায় কৃষকরা ‘পলিথিন থেরাপি’ বা পলিথিন দিয়ে বীজতলা আংশিক ঢেকে রাখার কৌশল অবলম্বন করছেন। এতে কোল্ড ইনজুরি ও ছত্রাকজনিত রোগের ঝুঁকি কমে। তবে এটি একটি সহায়ক ও উদ্ভাবনী পদ্ধতি, যা অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন ও প্রয়োজনীয় ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পাশাপাশি প্রয়োগ করা উচিত।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মোমিন বলেন, টানা ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে থাকায় কচি চারাগাছ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষকদের ছত্রাকনাশক ছিটানোর পাশাপাশি পলিথিন দিয়ে বীজতলা ও কচি চারা ঢেকে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে এই পদ্ধতি চারা রক্ষায় বেশ কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে।

ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক নাজমুল হক রঞ্জন জানান, গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত এ অঞ্চলে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কম ছিল। ৭ জানুয়ারি ঈশ্বরদীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা সেদিন দেশের সর্বনিম্ন ছিল। এছাড়া ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। টানা এমন পরিস্থিতিতে ঈশ্বরদী অঞ্চলের ওপর দিয়ে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে বলে আবহাওয়া অফিস নিশ্চিত করেছে।