বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু লাভজনক যুদ্ধবিমান বাজারে নতুন এক ‘উদীয়মান শক্তি’ হিসেবে পাকিস্তানের নাম উঠে আসছে—পাকিস্তান-চীন যৌথভাবে নির্মিত জেএফ-১৭ থান্ডারকে ঘিরে। অন্তত আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে এমনই দাবি করা হয়েছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হচ্ছে, পাকিস্তান ইতোমধ্যে লিবিয়ার সঙ্গে ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান সরবরাহে বহু বিলিয়ন ডলারের চুক্তি চূড়ান্ত করেছে এবং সৌদি আরব, সুদান, বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি নিয়ে ‘উন্নত পর্যায়ের’ আলোচনা চলছে।
এই টানা ইতিবাচক প্রতিবেদনের ফলে জেএফ-১৭ ঘিরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হলেও প্রশ্ন উঠছে—প্রায় দুই দশক পুরোনো এই যুদ্ধবিমান হঠাৎ করেই এত আকর্ষণীয় হয়ে উঠল কেন?
জেএফ-১৭ প্রথম উড্ডয়ন করে ২০০৩ সালে এবং ২০১০ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে প্রাথমিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের আগে পর্যন্ত পাকিস্তান ছাড়া মাত্র দুটি দেশ এই বিমান কিনেছে।
২০১৫ সালে মিয়ানমার ১৬টি জেএফ-১৭ ব্লক-২ অর্ডার দেয়। তবে রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যার কারণে সেখানে বিমানগুলো একাধিকবার গ্রাউন্ডেড হয়েছে। ২০১৬ সালে নাইজেরিয়া তিনটি জেএফ-১৭ কিনলেও পরে আর অর্ডার দেয়নি; বরং ইতালির এম-৩৪৬এফএ যুদ্ধবিমান বেছে নেয়। এমনকি সহ-উৎপাদক দেশ চীনও এখন পর্যন্ত তাদের বিমান বাহিনীতে জেএফ-১৭ ব্যবহার করে না।
২০২৫ সালে কী বদলাল?
২০২৫ সালে আজারবাইজানের সঙ্গে ৪০টি জেএফ-১৭ কেনার ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি ছিল প্রকাশ্য ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এরপরই ডিসেম্বর থেকে রয়টার্সে একের পর এক প্রতিবেদন—লিবিয়া, সৌদি আরব, সুদান, বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির খবর।
বিশেষ করে লিবিয়ার সঙ্গে ১৬টি জেএফ-১৭ বিক্রির খবরটি আলোচনার জন্ম দেয়। যদিও লিবিয়ার পক্ষ থেকে শুধু একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা স্বীকার করা হয়েছে, যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি। তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী বা আইএসপিআরের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি—যা বিস্ময়কর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ ছাড়া লিবিয়ার ওপর জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে—এই বাস্তবতাও প্রশ্নের জন্ম দেয়।
ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের প্রভাব?
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে বিমান সংঘর্ষের পর থেকেই এই আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান দাবি করে, তারা একাধিক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, যার মধ্যে রাফালও রয়েছে। ভারত একাধিক দাবি প্রত্যাখ্যান করলেও একটি রাফাল হারানোর কথা স্বীকার করে।
তবে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এসব ভূপাতিত করার ঘটনা মূলত চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—জেএফ-১৭ নয়। তবু পাকিস্তান দাবি করে, জেএফ-১৭ দিয়ে ভারতের এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে, যা ভারত স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে।
একই সূত্র, একই গল্প?
রয়টার্সের প্রতিবেদনগুলোর আরেকটি মিল হলো—সব ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ এসেছে নামহীন সামরিক সূত্র থেকে। অপরদিকে, যেসব সরকারি কর্মকর্তা বা মুখপাত্রদের নামসহ উদ্ধৃত করা হয়েছে, তারা কেবল বৈঠক বা আলোচনা হয়েছে—এমন সাধারণ বক্তব্য দিয়েছেন, কোনো যুদ্ধবিমান চুক্তির কথা বলেননি।
উদাহরণ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেছেন, আলোচনায় সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে কথা হয়েছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ ছাড়া প্রতিটি প্রতিবেদনে আগের প্রতিবেদনগুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে জেএফ-১৭-এর ‘বর্ধমান আন্তর্জাতিক চাহিদা’ প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে—যা এক ধরনের আত্ম-উদ্ধৃতির বৃত্ত তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাস্তবতা নাকি প্রচারণা?
এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পকে একটি ‘উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, এমনকি বলা হচ্ছে—এই রপ্তানি সাফল্য পাকিস্তানকে আইএমএফ ঋণমুক্ত করবে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স লিখেছে, “আমাদের বিমানগুলো পরীক্ষিত, এত অর্ডার আসছে যে ছয় মাসের মধ্যে আইএমএফের দরকার নাও হতে পারে।”
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—এই গল্পগুলো কি বাস্তব চুক্তির প্রতিফলন, নাকি পরিকল্পিতভাবে একটি অর্থনৈতিক ও সামরিক সাফল্যের গল্প তৈরি করা হচ্ছে?
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে এই প্রচারণা কার হয়ে করছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম?
সূত্র: ইউরেশিয়ান টাইমস