রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আমতলীর ৯৯ লোহার সেতু এখন মৃত্যুফাঁদ

বরগুনার আমতলী উপজেলায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ৯৯টি লোহার সেতু এখন কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। যেকোনো সময় এসব সেতু ধসে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

২০২৪ সালের ২২ জুন হলদিয়া বাজার সংলগ্ন একটি সেতু মাইক্রোবাসসহ ধসে পড়ে নয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে। দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।

ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলোর দুই পাশে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, প্রবেশমুখে বাঁশের বেড়া ও ভারী যান চলাচল বন্ধে খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ এগুলো কেবল দায়সারা ও সাময়িক উদ্যোগ। স্থায়ী সমাধানের কোনো নিশ্চয়তা নেই।

২০ বছরের পুরোনো প্রকল্প, ১৫ বছরের অবহেলা

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছর থেকে ২০০৮-০৯ সাল পর্যন্ত ‘হালকা যান চলাচল প্রকল্প’-এর আওতায় আমতলীর সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় শতাধিক লোহার সেতু নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ২০০৮-০৯ সালের পর প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি না হওয়ায় এসব সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে একের পর এক সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

১৭ বছরে ১৫টি সেতু ধস, ৯ জনের প্রাণহানি

২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর থেকে শুরু করে আইলা, মহাসেন, রোয়ানু ও সর্বশেষ রিমালের প্রভাবে উপজেলার অধিকাংশ লোহার সেতু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৭ বছরে অন্তত ১৫টি সেতু ধসে পড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ২০০৭ সালে কেওয়াবুনিয়া খাল, ২০১৫ সালে সোনাখালী মুচল্লী বাড়ি ও সোনাখালী স্কুলের সামনে খাল, ২০১৬ সালে বাঁশবুনিয়া ও আমড়াগাছিয়া খাল, ২০১৯ সালে কুতুবপুর খাল, ২০২২ সালে কাউনিয়া, আরপাঙ্গাশিয়া ও হলদিয়া ইউনিয়নের একাধিক খাল, ২০২৪ সালে মধ্য চন্দ্রা খাল এবং ২২ জুন ২০২৪ সালে হলদিয়া বাজার সংলগ্ন সেতু মাইক্রোবাসসহ ধসে পড়ে নয়জনের মৃত্যু হয়।

বাঁশের সাঁকোই এখন হাজারো মানুষের ভরসা 

হলদিয়া বাজারের সেতু ধসের পর পুরো ইউনিয়নের সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই সেতুটি। বর্তমানে নারী সংসদ সদস্য প্রভাষক ফারজানা সুমির অনুদানে সেখানে একটি বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছে। সেই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো দিয়েই নারী, শিশু ও শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য রুহুল আমিন বলেন, ‘ব্রিজ ভাইঙ্গা যাওয়ার পর মোগো চলাচল বন্ধ হইয়া গ্যাছিল। এহন মহিলা এমপির দানে বাঁশের সাঁকো দিয়া কোনোরকমে চলি।’

নৌকা, ড্রাম আর ভাসমান সেতুতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত

হলদিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া গ্রামের বাঁশবুনিয়া খালের সেতুটি ২০১৬ সালে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর সময় ধসে পড়ে। আজও সেখানে নতুন সেতু নির্মাণ হয়নি। এলাকাবাসী বাধ্য হয়ে ডিঙি নৌকায় খেয়া পারাপার চালু করেছেন। কাউনিয়া খালের সেতু ধসের পর স্থানীয়রা চাঁদা তুলে প্লাস্টিকের ড্রাম ও কাঠ দিয়ে ভাসমান সেতু তৈরি করেছেন। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যাচ্ছে।

স্থানীয় শিক্ষক মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এক পাশে স্কুল, আরেক পাশে গ্রাম। সেতু না থাকায় বাঁশের সাঁকোই এখন হাজারো মানুষের একমাত্র ভরসা।’

এলজিইডির তালিকায় ৯৯ ঝুঁকিপূর্ণ সেতু

উপজেলা এলজিইডির তালিকা অনুযায়ী গুলিশাখালীতে ২৫টি, আঠারগাছিয়ায় ২১টি, হলদিয়ায় ১৮টি, চাওড়ায় ১২টি, আরপাঙ্গাশিয়ায় ৮টি, আমতলী সদরে ৮টি, কুকুয়ায় ৪টি এবং পৌরসভা এলাকায় ৪টি-মোট ৯৯টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

দায়িত্বশীলদের আশ্বাস, তবে অপেক্ষায় মানুষ

এলজিইডি প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ৯৯টি ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়েছে। আপাতত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব সেতু অপসারণ করে গার্ডার সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

বরগুনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদি হাসান খান বলেন, ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো অগ্রাধিকার তালিকায় পাঠানো হয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু করার আশা করছি।’

বারবার সেতু ধস, প্রাণহানি ও দুর্ভোগের পরও যদি কেবল ‘আশা’ আর ‘পরিকল্পনা’ তেই সীমাবদ্ধ থাকে উদ্যোগ, তবে আমতলীর মানুষকে আরও লাশ গুনতে হবে-এটাই বাস্তবতা। সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড নয়, জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী সেতু নির্মাণই এখন সময়ের দাবি।