আনুষ্ঠানিক ফলাফলের আগেই মিয়ানমারে সেনা-সমর্থিত দলের বিজয় দাবি

মিয়ানমারে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচনে সেনাবাহিনী সমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) নিরঙ্কুশ জয়ী হয়েছে। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দলটির একটি উচ্চপদস্থ সূত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। 

যদিও নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল পেতে চলতি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, তবে ইউএসডিপি দাবি করেছে যে তারা ইতিমধ্যে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। 

জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে বিরোধীরা ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ‘পাতানো’ এবং ‘প্রহসন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিসহ (এনএলডি) গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় এর বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

তিন ধাপে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের প্রথম দফা শুরু হয়েছিল গত ২৮ ডিসেম্বর। এরপর ১১ জানুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ এবং গত রোববার (২৫ জানুয়ারি) তৃতীয় ও শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। নির্বাচনের এই প্রক্রিয়ায় জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেনি বলে অভিযোগ উঠেছে, কারণ দেশটির গৃহযুদ্ধকবলিত বহু অঞ্চলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের নিয়ন্ত্রণের কারণে কোনো ভোটকেন্দ্রই খোলা সম্ভব হয়নি। myan.jpg2

জান্তা সরকার দাবি করেছে যে এই ভোটের মাধ্যমে তারা জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবে, কিন্তু ইয়াঙ্গুনের সাধারণ বাসিন্দারা বলছেন যে জান্তা নিজেই এখানে খেলোয়াড় এবং নিজেই রেফারি। বিশ্লেষকদের মতে, ইউএসডিপি মূলত সেনাবাহিনীর একটি ‘নাগরিক মুখোশধারী প্রক্সি দল’ হিসেবে কাজ করছে।

মানবাধিকার সংস্থা ফর্টিফাই রাইটসের এক নতুন প্রতিবেদনে মিয়ানমারের বর্তমান যুদ্ধকালীন ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও গেরিলাদের দমন করতে জান্তা সরকার এখন আকাশপথে হামলার জন্য প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টারের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে, যার ফলে বেসামরিক মানুষের হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকে মিয়ানমারে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জান্তা সরকার সেটিকে একটি কৃত্রিম ‘নাগরিক বৈধতা’ দেওয়ার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ টম অ্যান্ড্রুস এই নির্বাচনী কর্মকাণ্ডকে একটি ‘প্রতারণা’ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক মহলকে এর ফলাফল প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানিয়েছেন।

মিয়ানমারের বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ আসন আগে থেকেই সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকে। নতুন পার্লামেন্ট গঠিত হওয়ার পর সব সদস্যের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে, মিন অং হ্লাইং সামরিক ইউনিফর্ম খুলে নিজেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। 

এই নির্বাচনী ফলাফল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত না হলে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান আরও পিছিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এপ্রিলে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে কোনো উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি, বরং সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান লড়াই দেশটিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সূত্র: এএফপি