সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর
পাড়ায় নতুন আসা মেয়েটা কাল ফট করে হিরুকে বলে দিল, ও নাকি একজন সিজোফ্রেনিক রোগী! আগস্টের এই প্রথম ভাগে হিরু চেয়েছিল, বন্ধু দিবসের দিনে রুশালির সঙ্গে দিনভর জমিয়ে আড্ডা দেবে। বন্ধু-দিবসে রুশালি হিরুর প্রতি মোহাবিষ্ট হয়ে প্রপোজও করে ফেলতে পারে! উল্টো তার মুখ থেকেই কিনা এমন অপ্রিয় কথা শুনতে হলো!
সকাল সকাল এসে উপস্থিত হিরুর এক বাল্যবন্ধু। হিরুরা তখন তোতা চাকলাদারের দোকানে বসে গরমাগরম চা গিলছিল।
ছেলেটা এসে চায়ের অর্ডার দিল। তার আগে এটা-ওটাও খেল। তারপর নির্বিকার চলে যাওয়ার ভান করে, তারপর হঠাত্ কিছু মনে পড়েছে এমন ভাব করে, ফিরে এসে তোতা চাকলাদারকে বলল, ‘বিল আমার বাল্যবন্ধু হিরুর থেকে নিয়েন।’
তোতা চাকলাদারের মুখখানা তখন দেখার মতো হলো। অস্ফুটে বলল, ‘হিরুর থেকে?’
‘হ্যাঁ। হিরুকে আমার কথা বললেই ও দিয়ে দেবে।’
তোতা চাকলাদার একবার হিরুর মুখের দিকে তাকাল। বেচারা এখনো চা পান আর চ্যালাদের সঙ্গে কথা বলায় মশগুল। তবে, এখান থেকে যে দূরত্বে ও বসে আছে, তাতে এই আগন্তুকের সমস্ত কথাই ওর কানে পৌঁছানোর কথা।
তোতা চাকলাদার বাঁকা হাসি হেসে বলল, ‘তা হিরুকে কী বলব?’
‘বলবেন যে, ওর বাল্যবন্ধু হাসান এসে খেয়ে গেছে।’
‘এই কথাটা আপনি হিরুকে দিয়ে বলালেই তো পারেন।’
হঠাত্ সিরিয়াস হওয়ার ভঙ্গি করে আগন্তুক বলল, ‘হিরু আমার বাল্যবন্ধু। ন্যাংটাকালের বন্ধু যাকে বলে। ছোটবেলায় আমরা দুজনে ন্যাংটা হয়ে কত ঘুরেছি!’
‘তারপর?’ যেন নতুন কিছু জানতে পেরে চাকলাদারের আগ্রহ সপ্তম আসমানে পড়ল। হিরুর সম্পর্কে স্পেশাল কিছু জানা যাচ্ছে। তাও হিরুর সামনেই। নিশ্চয়ই সবকিছু সত্য। নাহলে হিরু সেই কখন কথার মাঝে বাগড়া দিত।
আগন্তুক বলে চলল, ‘একসাথে অনেক ক্লাস একসাথে পড়েছি আমরা। হিরু তো আকসারই ফেল মারত। ফেল মেরে মেরে ও নিচের ক্লাসে নেমে যেতে লাগল। ওদিকে, আমি প্রোমোশন পেয়ে অন্য স্কুুলে গিয়ে ভর্তি হলাম।’
‘তারপর?’
‘তরপর আর কিছু নাই। ওর সাথে আমার যোগাযোগ নেই বহু বছর হলো। ও কোথায় আছে, কেমন আছে—তা জানবার বহু আগ্রহ হলো। তাই খোঁজ নিতে নিতে এই অব্দি চলে এসেছি। শুনলাম, আপনার দোকানে নাকি নিয়মিত চা খায় ও। অবশ্য, বেশিরভাগ সময়েই ও নাকি লোকের পকেট ভাঙে! এদিকে, আমার পকেটেও হাজার টাকার নিচে নোট নেই। ভাবলাম—দুই-পাঁচ টাকা বিল করে আমি কেন পরিশোধ করতে যাব। হিরুর এলাকায় এসেছি, ওই দেবে। এককালের বাল্যবন্ধু হলেও, আমি এখন ওর গোস্ট!’
‘ওটা গোস্ট নয়, গেস্ট।’ পেছন থেকে হিরু উঠে এসে ভুলটা ধরিয়ে দিল।
‘ওহ, স্যরি স্যরি!’
হিরু কিছু না বলে চাকলাদারকে বিল পরিশোধ করে দিল। ‘এটাসহ।’
‘আপনি কেন আমার বিল দেবেন, মশাই?’
‘আরে দিলামই নাহয় একদিন।’
‘না, চিনি না জানি না আপনাকে দিয়ে আমার বিল দেওয়াতে পারব না। স্যরি।’
‘আজকে দিই? পরেরটা নাহয় আপনিই দিলেন?’
লোকটা হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘কী আর করার... পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। আমি তাহলে আজ আসি, কেমন?’
হিরুর বাল্যবন্ধুটি চলে গেল।
তোতা চাকলাদার অবাক মুখে জানতে চাইল, ‘তোমাকে চিনল না?’
হিরুও চিন্তিতমুখে বলল, ‘ন্যাংটাকালে যেমন ছিলাম, এখন তো আর তেমনটা নেই। চিনবে কী করে?’
হিরুর মনে বারবার অস্বস্তি জাগছে। গতকাল রুশালির বলা কথাগুলোই ওর মনের কোণে বারবার উঁকি দিচ্ছে। সিজোফ্রোনিক, সিজোফ্রেনিক...
‘হয়তো সত্যিই এটা আমার বাল্যবন্ধু। আমি বেমালুম ভুলে গেছি।’ হিরু স্বগতোক্তি করল।
আড়চোখে দেখল, হাসান নামধারী বাল্যবন্ধুটি অদূরে গিয়ে মোবাইলে কতক্ষণ টেপাটিপি করে এদিকেই ফিরে আসতে লাগছে।
‘বন-ধুউউউউউউ’ এই বলে হঠাত্ সে সিনেমার নায়িকাদের মতো করে দৌড়ে আসতে লাগল।
হিরুও পাল্টা দৌড় লাগাল। হাসান যেন কিছুটা থতমত খেল। তারপর হলো সেই অপূর্ব দৃশ্যের দৃশ্যায়ন। দুই বন্ধু একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছে।
‘বন্ধু, কতদিন বাদে তোর সাথে দেখা, চল বাসায় চল।’
‘না রে, আজ তোর বাসায় যাব না। অনেক আগেই প্রতিজ্ঞা করেছি—জীবনে ভালো কিছু করতে পারলে, তবেই কাকিকে মুখ দেখাব।’
‘তাহলে? চলে যাবি?’ হিরুর কণ্ঠে বিচ্ছেদের সুর।
‘তোদের এখানে হোটেল-টোটেল, থাকার জায়গা নেই কোনো?’
‘আছে। চল তাহলে।’
হাসানকে নিয়ে হিরু একটা হোটেলে গেল। সেখানেই হাসানের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো।
বিকেলে হিরু বের হলো লুঙ্গি পরে। সবাই জানে, লুঙ্গিতে কোনো পকেট থাকে না। তাই সুযোগ সন্ধানী, এতকাল যারা ওর বন্ধু সেজে ছিল, তাদের ভেতরের রূপখানা সহজেই দেখতে পেল ও। তারা এককাপ চা পর্যন্ত অফার করল না।
একটু পরেই হাসান এসে হাজির। হিরুকে লুঙ্গি পরা অবস্থায় দেখে একটু যেন দমে গেল।
‘লুঙ্গি কেন?’
‘ভাবলাম, তুই আমার লুঙ্গিকালের বন্ধু। তোর সাথে আজ বরং লুঙ্গি পরেই ঘুরি।’
হাসানের মুখটা পাতিলের মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল। ‘ভেবেছিলাম, তোকে নিয়ে চাইনিজ খেতে যাব!’
‘তো, সমস্যা কী?’
‘না মানে... তুই নিশ্চয়ই ওখানে লুঙ্গি পরে যেতে চাইবি না।’
‘সমস্যা নেই। আজকে আর প্যান্ট-শার্ট পরছি না। ইভেন, তুই যতদিন এখানে আছিস, ততদিন তোর সাথে লুঙ্গি পরেই ঘুরব। এখন চল।’
হাসানের মুখখানা ততক্ষণে শুকিয়ে আমসি। কোনোমতে ঢোঁক গিলে বলল, ‘কো-কোথায়?’
‘কেন, তুই না বললি, আজ আমাকে চাইনিজ খাওয়াবি?’
‘আরে, আমি তোকে খাওয়ানোর কথা কখন বললাম...,’ হাসান যেন বিরক্ত।
হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘আরে, এসব কথা বলতে হয় নাকি? বুঝে নিতে হয়!’
‘না মানে... আমি তো মানিব্যাগখানা রুমেই ফেলে রেখে এসেছি।’
‘সমস্যা নাই। আমাদের এখানকার চাইনিজ রেস্টুরেন্টটা তোর হোটেলে যাওয়ার দিকেই। আগে হোটেলে গেলাম। তারপর নাহয়...’
‘নাআআআ!’ হাসান প্রায় চিত্কার করে উঠল। তারপর, আশপাশের লোকজনের ভাবভঙ্গি দেখে থমকে গেল। বোধহয় একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে!
এখানে এসেছিল হিরুর এক শত্রুর আমন্ত্রণে। আজ বন্ধু দিবসের দিনে হিরুকে আচ্ছা মতো বাঁশ দেওয়াই উদ্দেশ্য ছিল। চেয়েছিল, তোতা চাকলাদারের সঙ্গে ওই সামান্য বিল দেওয়া নিয়ে হিরুর ক্যাঁচাল বাঁধবে! ভেবেছিল, বিল দেওয়া নিয়ে হিরু বেঁকে বসবে। বলবে, চিনি না জানি না এমন একজন এসে আমার বন্ধু পরিচয় দিয়ে খেয়ে গেল, আর আমি তার বিল দিয়ে দেব? ব্যস লেগে যাবে হাঙ্গামা।
তারপর হিরুকে চাইনিজে নিয়ে পকেট খসাবে। ওদিকে হোটেলেও বিস্তর বিল হয়ে গেছে, তাও হিরুকে দিয়েই খসানোর প্ল্যান ওর! কিন্তু এখন বাঁশটা যে ও নিজেই খেতে চলেছে...
ওদিকে, হিরু ভেবে বসে আছে, হাসান সত্যিই ওর বাল্যবন্ধু। এখন নাহয় ওর মানসিক অবস্থা ভালো নয়। ছোট্টবেলার সকল স্মৃতি বেমালুম ভুলে আছে। কিন্তু হাসান যা বলছে, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। আর বাল্যবন্ধু হাসান ওর কাছে এসেছে না ও বাল্যবন্ধুর বাড়িতে গেছে, সেটা মুখ্য নয়। মুখ্য কথা হলো, বন্ধুকে নিয়ে ব্যাপক ‘চিল’ হবে। রুশালির সঙ্গে আড্ডাবাজি হলো না তো কী হয়েছে, রুশালির থেকে আপন কাউকে তো পাওয়া গেছে। বন্ধুর খাতিরে ও যেহেতু লুঙ্গি পরে বেরিয়েছে, আজকের যাবতীয় খরচ নাহয় বন্ধু হাসানই চালিয়ে নিক!
হোটেলে আসতে না চাইলেও হিরুর জোরাজুরিতে হাসানকে এ পথ ধরতে হলো। কিন্তু হোটেলে ঢুকেই ওরা বুঝতে পারল, এখানকার পরিবেশ বিশেষ সুবিধের নয়। কেমন জানি থমথমে।
একজন বলল, ‘ওই যে চোরটা এসে গেছে।’
মুহূর্তের মধ্যেই উপস্থিত বোর্ডারদের কিল-ঘুষি এসে পড়তে লাগল হাসানের মুখে চোখে।
‘আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না।’ সকলের মধ্য থেকে হিরু হাসানকে উদ্ধার করল।
পরিস্থিতি একটা শান্ত হলে হিরু সমস্ত রহস্যোত্ঘাটন করতে চাইল।
হাসান একজন পেশাদার পকেটমার। অতি সূক্ষ্মভাবে কারোর পকেট মারতে জুড়ি নেই তার। হিরুর পকেট থেকে মানিব্যাগ, মোবাইল ইত্যাদি মেরে দেওয়ার প্ল্যান ছিল তার। তারপর হিরু খেতে গিয়ে যখন বিল দিতে পারত না, তখন হোটেলের লোকজনের তরফ থেকে প্যাদানিও জুটত। কিন্তু...
হাসান দুপুরে হোটেলেরই একজনের পকেট মারে। সিসিটিভি ফুটেজে ধরাও খেয়ে যায়। তখন থেকেই তারা বসে ছিল, হাসান ফিরলেই রামপ্যাদানি প্যাদানো হবে ওকে। তারপর ভরা হবে জেলের চৌদ্দশিকের ভেতর।
হিরু লোকজনকে বুঝাতে সমর্থ হলো, হাসান একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি। কোনো পকেটমার নয়। অন্যের পকেটকে ও নিজের পকেট ভেবে বসে। ওর কারণেই আজ তাকে পকেটওয়ালা প্যান্ট বাদ দিয়ে লুঙ্গি পরে বেরোতে হয়েছে।
‘এখুনি হোটেল ছাড়তে হবে। চোর হোক বা পাগল, এর জায়গা হবে না এই হোটেলে।’
বাধ্য হয়ে হাসানকে নিয়ে বেরিয়ে এল ও। বলা বাহুল্য, বিলটা হাসানের মানিব্যাগ থেকেই খরচা হয়েছে।
‘অনেক মাইর খেলি। এখন তাহলে বাসায় চল। এসব নিয়ে একদম চিন্তা করবি না।’ হিরু ওর বাল্যবন্ধুকে বলল।
হাসান যেন টাসকি খেল। এখনো হিরু ওকে নিয়ে ভাবছে। আর ও কিনা...
একটু ইতস্তত করে শেষে হিরুকে জড়িয়ে ধরল ও। বলল, ‘এখন আর একান্ত বন্ধুর কাছেও এমন ব্যবহার আশা করা যায় না। আর তুমি আমার বন্ধু না হয়েও...’
‘তুমি আমার বন্ধু নও...?’
হাসান পুরো কাহিনি খুলে বলল।
‘কে লাগিয়েছে তোমাকে?’
‘রু-রুশেলি।’
‘রুশেলি!’ হিরু বাকরূদ্ধপ্রায়। ‘কেন?’
‘মেয়েটা নাকি তোমার বন্ধু হতে চেয়েছিল। আর তুমি কিনা তাকে পাত্তা দিচ্ছ না।’
‘পাত্তা দিচ্ছি না? গতকালকেই তো ওর সাথে ঘুরলাম। যাবার সময় ও আমাকে বলে গেল...’
‘তোমাদের একসাথে ঘোরার কথা ছিল। কিন্তু তুমি আসোনি।’
‘আমি যাইনি?’ হিরুর কণ্ঠটা কেমন যেন মিইয়ে গেল।
‘মেয়েটা কাল পুরো রাত কেঁদেছে। সকালে আমাকে তোমার ছবি পাঠিয়ে কী কী করতে হবে তা জানাল। চায়ের দোকানে যখন তোমার সাথে আমার কথা হলো প্রথমে চিনতেই পারিনি। পরে ছবি মিলিয়ে শিওর হই।’
‘তোমার সাথে ওর পরিচয় কিভাবে?’
‘ওরা আগে আমাদের বাসার কাছেই থাকত।’
‘ও জানে যে তুমি একজন পকেটমার?’
‘হ্যাঁ, সে জন্যই তো ফিরিয়ে দিয়েছিল।’
‘কী?’
‘আমি ওকে প্রপোজ করেছিলাম।’
‘ওহ। ওর থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েও ওর হয়ে কাজ করতে এসেছ?’
‘কী করব, বন্ধু বলে কথা...’
‘তা তোমার বন্ধু এখন কোথায়?’
‘বলল, বিকেলে একজনের সাথে ডেটিংয়ে যাবে। তাই গেছে হয়তো।’
‘আচ্ছা।’ হিরু কী বলবে ভেবে পেল না।
‘যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে।’
‘কী?’
‘ওর সাথে তোমার বন্ধুত্ব হয়নি। বরং আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু। কথা দিলাম, আজ, এখন থেকে সকল বাজে কাজ ছেড়ে দিলাম।’
‘চল...’
‘কোথায়?’
‘কোথায় আবার, আমাদের বাসায়। মাকে আমার বাল্যবন্ধুর কথা বলেছিলাম। তিনি তোমাকে বাসায় যেতে বলেছেন। তোমার জন্য মা অনেক কিছুর আয়োজন করেছেন।’
‘কিন্তু... আমি তো তোমার বাল্যবন্ধু নই।’
হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘তাতে কী! জানো না আজ বন্ধু দিবস? আজ আমরা জমিয়ে আমাদের বন্ধুত্বকে সেলিব্রেট করব।’ g