প্রকৃতিতে চলছে মাঘ মাস; কিন্তু নেই চিরচেনা মাঘের সেই কনকনে শীত। দিনে গরম আর রাতে কিছুটা শীত অনুভূত হলেও পুরো দেশ জুড়ে একটা শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করছে। তাপমাত্রার এমন ওঠানামার কারণে সারা দেশে বেড়েছে সর্দি-কাশির প্রকোপ। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীগুলোর একটি হওয়ার কারণে এখানে সর্দি-কাশি এবং শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বেশি হচ্ছে এবং আক্রান্তদের সুস্থ হতে সময় লাগছে বেশি।
চিকিৎসকেরা বলছেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এই সময় দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে জ্বর-সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এই সময়ে আমাদের বায়ুদূষণের যে মাত্রা, বিশ্বের সবচেয়ে দূষণযুক্ত শহরের মধ্যে ঢাকা অন্যতম। এই সময়ের বায়ুতে বিভিন্ন ধরনের পার্টিকেল থাকে সেটা অনেক বেড়ে যায়। যেমন—লেড বা সিসা আছে, সালফারডাই অক্সসাইড আছে, এ ধরনের কিছু উপাদান শ্বাসের সঙ্গে ভেতরে ঢুকে এসব সমস্যা তৈরি করে। এই সময়ে ঢাকার অবস্থান দূষিত শহরের এক, দুই বা তিন চার নম্বরে থাকছে। তার মধ্যে কিছু ভাইরাস আছে যেগুলো শীতকালে সংক্রমিত করে। শীতকাল আমাদের শ্বাসনালি যদি কোনো কারণে দুর্বল হয়ে যায়, তখন বিভিন্ন জীবাণুর সংক্রমণ হয়, আবার রেসপেরেটরি সেনসেটিভ ভাইরাস আছে, এই ভাইরাসগুলোও শীতকালে সমস্যা তৈরি করে।
ধুলাবালি থেকে রক্ষায় মাস্ক পরতে হবে এবং এ সময় পারতপক্ষে বাইরে কম বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। বাইরের খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
গতকাল সোমবার বিশ্বের ১০০টি নগরীর মধ্যে বায়ুদূষণে শীর্ষে ছিল ঢাকা। এ সময় ঢাকার বায়ুর মান ছিল ২৫৯। বায়ুর এই মানকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলে গণ্য করা হয়। নগরীর একটি স্থানে সোমবার দূষণের মাত্রা ৪০০-র বেশি। এ অবস্থা ‘বিপর্যয়কর’। এ স্থানটিসহ নগরীর আট স্থানে দূষণ পরিস্থিতি খুব খারাপ ছিল। রাজধানী ঢাকার এ অবস্থা বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে।
রাজধানীর কয়েকটি হাসাপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে রোগী বেড়েছে। এছাড়া চিকিৎসকদের চেম্বার এবং রোগ নির্ণয় কেন্দ্রগুলোতেও বেড়েছে রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। রোগীদের বেশির ভাগই শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ব্রংকিউলাইটিস, ডায়রিয়া, সর্দি-জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসছে। তবে চিকিৎসকরা অধিকাংশ রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। সেখানে কথা হয় হীরা বেগমের সঙ্গে, তিনি বলেন, ‘চার দিন ধরে শুকনো কাশি, সঙ্গে হালকা জ্বর, রাতে কাশি বেড়ে যায়, কাশির জন্য ঘুমাতে পারি না। ফার্মিসি থেকে কাশির সিরাপ আর এলার্জির ওষুধ খেয়েছি, কাজে দিচ্ছে না। তাই আজকে ডাক্তার দেখাতে এসেছি। অন্য একজন রোগী মো. নূরুজ্জামান বলেন, শুকনা কাশি ভালো হচ্ছে না। সঙ্গে জ্বর আছে, নাক দিয়ে পানিও পড়ছে। বাড়িতে বাচ্চার ও বাচ্চার মায়েরও একই সমস্যা আছে। ডাক্তার বুকের এক্সরে করতে দিয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে শিশুদের নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ব্যবস্থাপত্র নিতে দেখা যায় অভিভাবকদের। কথা হয় চার বছরের নুসরাতের মায়ের সঙ্গে তিনি এসেছেন কল্যাণপুর থেকে। বলেন, মেয়ের এলার্জিতে মুখ হাত-পা ফুলে গেছে, আছে সর্দি কাশিও। বাড়ির পাশের ফার্মিসি থেকে ওষুধ এনে খাইয়েছি, মেয়ে এখন দুর্বল গয়ে গেছে, খেতে পারে না, কাশতে কাশতে বমি করে দিচ্ছে, তাই ডাক্তার দেখাতে এসেছি। পাশেই দাঁড়ানো দুই বছরের রাসনি ও ছয় বছরের সোহেল রানার একই অবস্থা।
ইমেরিটাস অধ্যাপক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের এই সময়টাতে ঘরে ঘরে সর্দি-কাশি হচ্ছে, ঢাকায় যারা আছেন, তাদের কাশি ভোগাচ্ছে বেশি। কারণ হিসেবে এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলেন, ঢাকার আবহাওয়া অনেক বেশি খারাপ। ফলে এই সময়টাতে সচেতন থাকতে হবে। বাচ্চারা বাইরের খাবার খাবে না, স্কুলে দৌড়-ঝাঁপ কম করবে, বাইরে গেলে মাস্ক পরে বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজির আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, সর্দি-কাশিটা হয় দুই কারণে, এই সময়ে সর্দি-কাশিটা হচ্ছে বায়ুদূষণের কারণে। এই সময়ে বায়ুদূষণটা বেড়ে যায়। যার ফলে যাদের এমনিতে শ্বাসনালির সমস্যা আছে—যেমন অ্যাজমা, হাঁপানি কিংবা ব্রংকিওলাইটিস, শ্বাসনালির কোনো সমস্যা থাকলে, তাদের এটা বেড়ে যায়। ফলে তারা এই সময়ে বেশি ভোগেন। এই সময়ে আমাদের বায়ুদূষণের যে মাত্রা, বিশ্বের সবচেয়ে দূষণযুক্ত শহরের মধ্যে ঢাকা অন্যতম। এই সময়ে ঢাকার অবস্থান দূষিত শহরের এক, দুই বা তিন-চার নম্বরে থাকছে। তার মধ্যে কিছু ভাইরাস আছে যেগুলো শীতকালে সংক্রমিত করে। এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, শীতকাল আমাদের শ্বাসনালি যদি কোনো কারণে দুর্বল হয়ে যায়, তখন বিভিন্ন জীবাণুর সংক্রমণ হয়, আবার রেসপেরেটরি সেনসেটিভ ভাইরাস আছে, এই ভাইরাসগুলো শীতকালে বিশেষ করে শিশুদের নিউমোনিয়া তৈরি করে। এ কারণে শীতকালে অনেক শিশু মারা যায় ভাইরাসের সংক্রমণে। এই সময়ের বায়ুতে বিভিন্ন ধরনের পার্টিকেল থাকে সেটা অনেক বেড়ে যায়। যেমন—লেড বা সিসা আছে, সালফারডাই অক্সসাইড আছে, এ ধরনের কিছু উপাদান আছে যেগুলো শ্বাসের সঙ্গে ভেতরে ঢুকে এসব সমস্যা তৈরি করে।