চট্টগ্রাম বন্দরের একমাত্র বিশ্বমানের টার্মিনাল এনসিটি নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে বিতর্কিত বিদেশী কোম্পানির হাতে কনসেশন চুক্তিতে লিজ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত আত্মঘাতি ও দেশীয় স্বার্থবিরোধী। তাই এই সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন দমাতে স্বৈরাচারী কায়দায় শ্রমিক নেতাদের বদলিসহ সরকারি নির্দেশে নানানভাবে দমন-পীড়নের চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১১টায় আগারগাঁওয়ের সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষ কার্যালয়ের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশে এই মন্তব্য করেন সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ।
সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ বলেন, এর পূর্বে আওয়ামীলীগ একটি এবং ইন্টেরিম দুইটি টার্মিনাল – চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল বিদেশিদের দেওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ টেনে আনাসহ বাংলাদেশকে সোমালিয়া-সোমলিল্যান্ড ও সুদান-ইয়েমেনের মত সংকটময় পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের অতীত কর্মকাণ্ড এমনটাই বলে অভিযোগ সংগঠনটির নেতৃবৃন্দের।
স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির নেতৃবৃন্দ বলেন,
১. অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কেবল ‘টার্মিনাল অপারেটর’ হিসেবে নয় বরং আফ্রিকান মডেল অনুসরণ করে দীর্ঘমেয়াদী ‘কনসেশনিয়ার’ হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে যা জাতীয় নিরাপত্তা, দেশীয় নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর বিদেশি কনসেশনিয়ারের নিয়ন্ত্রণে থাকলে অর্থনৈতিক মন্দা, দুর্ভিক্ষ এবং সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। তাছাড়া দেশীয় ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম বন্দরে যেখানে প্রতি কন্টেইনারে (TEU’s) গড়ে প্রায় ১৬১-১৬৭ মার্কিন ডলার রেভিনিউ পায়, বিদেশিদের কাছে কনসেশন চুক্তিতে এই রেভিনিউ অনেক কমে আসবে। ফলে দেশের রিজার্ভের উপর চাপ তৈরি হবে।
২. উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া ও দেশী-বিদেশী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে বিডের সুযোগ না দিয়ে চুক্তি সম্পাদনের চেষ্টা অস্বচ্ছতা, কমিশন বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রশ্ন উঠেছে।
৩. সিঙ্গাপুর পোর্টের মত চট্টগ্রাম বন্দরকে আমরা একটি রিজিয়নাল হাব বানাতে চাই। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ড, এপিএম টার্মিনালস, মেডলগ - এরা কখনই চায় না বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর রিজিয়নাল হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। ব্যক্তিগত স্বার্থ, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও রিজিয়নাল হাব হতে বাধা দিতেই দেশি-বিদেশি লবিস্টরা চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশি সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিতে চাচ্ছে।
৪. ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটি লিজ দেওয়া ভারত-ইজরাইলের ‘আইমেক করিডর’ পরিকল্পনার অংশ। এই করিডরে একবার যুক্ত হয়ে গেলে চট্টগ্রাম বন্দর ইসরায়েল-ইন্ডিয়ার সিন্ডিকেট থেকে আর বের হতে পারেবে না। এছাড়া I2U2 (India, Israel, UAE, USA) মাল্টিলেটেরাল চুক্তির থাকায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে চট্টগ্রাম বন্দর চলে গেলে মাল্টিলেটেরাল পার্টনার হিসেবে আরব আমিরাতের ঘণিষ্ঠ মিত্র ভারত, ইজরাইল ও আমেরিকার পরোক্ষ উপস্থিতি, প্রভাব ও তাদের বার্গেইনিং পাওয়ার আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরে নিশ্চিত হবে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে যে কোনো মুহূর্তে ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।
৫. 'সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের বন্দরও বিদেশিরা চালায়' মর্মে প্রোপাগাণ্ডা ছড়াচ্ছে অথচ বাস্তবে সিঙ্গাপুরের একটি কন্টেইনার টার্মিনালও বিদেশি অপারেটররা চালায় না। এমনকি ভিয়েতনামে কোনো টার্মিনাল এককভাবে কোনো বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া হয়নি। এককভাবে বিদেশিদের দেওয়া হয়েছে মূলত আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোতে।
৬. বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারের উন্নীত করতে এবং বন্দর ব্যবস্থাপনায় জট, সিন্ডিকেট ও দুর্নীতি দূর করতে হলে বন্দর ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। এক্ষেত্রে সাগর ও নদীকেন্দ্রিক চীনের মডেল অনুসরণযোগ্য। কিন্তু সরকার গৃহীত কনসেশন চুক্তি আফ্রিকান মডেল যা গ্রহণ করলে বাংলাদেশের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। বন্দর ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারলে এতে পরিবহন খরচ কমবে, পণ্যের দাম হ্রাস পাবে, জেলাভিত্তিক শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আমদানি-রপ্তানি ও তৃণমূল পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গতি আসবে। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে “পোর্ট অপারেটিং” বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। বিদেশি আনার নামে এই দেশীয় শিল্প ধ্বংস না করে বরং এটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে এবং দেশের পাশাপাশি বিদেশে বন্দর পরিচালনার সুযোগ পেতে সরকারকে দেশিয় অপারেটরদের সহায়তা করতে হবে।
অতএব, সরকারকে অবশ্যই নিউমুরিং টার্মিনালকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে লিজ প্রক্রিয়া থেকে অনতিবিলম্বে ফিরে আসতে হবে। নইলে তীব্র আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হবে সরকারকে।
বিক্ষোভ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির আহবায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হক, যুগ্ম আহবায়ক মুহিউদ্দিন রাহাত, দপ্তর সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, জুবায়েদুল ইসলাম শিহাব, জাবির বিন মাহবুবসহ প্রায় হাজার খানেক শিক্ষার্থী-জনতা।