দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সাতক্ষীরা-১ আসনের প্রায় ৫ লাখ ভোটারের দুটি উপজেলা বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের স্পষ্ট আভাস ফুঁটে উঠেছে জনমনে। কদর বেড়েছে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও আওয়ামী লীগের ভোটারদের। তবে গণভোটের আমেজ বিলীন হয়েছে দলীয় প্রতীকের ভোটের ভিড়ে। এমনটাই জানালেন অনেক সাধারণ ভোটার ও রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিরা।
সাতক্ষীরা-১ আসনটি কলারোয়া ও তালা উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই দুই উপজেলাতেই ১২টি করে মোট ২৪টি ইউনিয়ন রয়েছে। রয়েছে কলারোয়ার একটি পৌরসভাও। ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তায় নাম লিখিয়েছেন। তারা হলেন- বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের হাবিবুল ইসলাম হাবিব, জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মো. ইজ্জত উল্লাহ, বাংলাদেশ কংগ্রেসের ডাব প্রতীকের মো. ইয়ারুল ইসলাম, জাতীয়পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের জিয়াউর রহমান ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের শেখ মো.রেজাউল করিম। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ও সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিব ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহের মধ্যেই। তাদের দু’জনের বাড়িই কলারোয়া উপজেলায়।
সাতক্ষীরা জেলা নির্বাচন অফিসার মো.মাসুদুর রহমান জানান, এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৮৪৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৭৩ ও মহিলা ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৩ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছে দুই উপজেলায় ২ জন। কলারোয়া উপজেলায় মোট ভোটার ২ লাখ ২০ হাজার ৫৭ জন আর তালা উপজেলায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৭৯১ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৬৮টি। এরমধ্যে কলারোয়া উপজেলায় ৭৫টি ও তালায় ৯৩টি।
কলারোয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসার জানান, ইতোমধ্যে নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। ভোটগ্রহণে দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রশিক্ষণও সম্পন্ন হয়েছে।
থানার ওসি এইচএম শাহীন জানান, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল ও নজরদারী জোরদার করা হয়েছে। বিজিবি বেইজ ক্যাম্প স্থাপন করেছে।
বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা দুই উপজেলা চষে বেড়াচ্ছেন গণসংযোগে ও ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে। প্রতিদিন একাধিক স্থানে নির্বাচনী জনসভা করছেন। তারা নিজদলীয় কর্মীসমর্থক-ভোটারদের উজ্জীবিত রাখছেন, ছুটে যাচ্ছেন সাধারণ ভোটারদের পাশে। নানামুখি প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এলাকার উন্নয়ন আর মানুষের পাশে থাকার। এদিকে, কংগ্রেস প্রার্থীর কিছুটা মাঠে দেখা গেলেও লাঙ্গল আর হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থীদের তেমন প্রচারণা দেখা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ভোটার জানান, প্রার্থী ও তাদের নেতাকর্মীদের বিগত দিনের আচরণ-ব্যবহার দেখে আমরা ভোট দেবো। আমরা চাই সুশাসন, দুর্নীতি-মাদক-দখলবাজমুক্ত সমাজ। যিনি এলাকা ও মানুষের উন্নয়নে নিবেদিত হতে পারবে তাকেই আমরা চাই।
সাধারণ ভোটার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কলারোয়ার চেয়ে তালা উপজেলায় যেমন ভোটার সংখ্যা বেশি, ঠিক তেমনি সেখানে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটার ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোট বেশি। হিন্দু ও আওয়ামী ভোটই এই আসনে জয়-পরাজয়ের নির্ণায়ক হতে পারে। ফলে স্বভাবতই হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রার্থী ও তাদের নেতাকর্মীদের যেমন ‘বিশেষ কদর’ বেড়েছে ঠিক তেমনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও আওয়ামী লীগে ভোটারদের প্রতি সখ্যতা চোখে পড়ার মতো।
কলারোয়া উপজেলায় ধানের শীষের চেয়ে দাঁড়িপাল্লার ওজন ভারী হতে পারে -এমনটাই উঠে এসেছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ মানুষের অভিপ্রায়ে। তবে তালা উপজেলার চিত্র ভিন্ন। কত সংখ্যক ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাবেন এমন শঙ্কা থাকলেও হিন্দু ও আওয়ামী আধিক্যতায় ধানের শীষের ফলন বেশি হতে পারে। সেখানে বিএনপি ও জামায়াত ঘরণার বাইরে হিন্দু ও আওয়ামী ভোটাররা যত বেশি ভোটকেন্দ্রে যাবেন, তাদের বেশিরভাগ ভোট ধানের শীষ প্রতীকে যাওয়ার সম্ভাবনাই দৃঢ়।
ফলে কলারোয়া উপজেলায় দাঁড়িপাল্লার কিছুটা ভালো অবস্থান পরিলক্ষিত হলেও তালায় ধানের শীষের তুলনামূলক ভালো অবস্থানের কারণে বিএনপি-জামায়াতের লড়াই হতে পারে হাড্ডাহাড্ডি। দুই প্রতীকে দুই উপজেলার ভোটের ব্যবধান আর হিন্দু-আওয়ামী ভোটই এই আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হতে পারে।
এদিকে, গণভোটের প্রচারণা সরকারি উদ্যোগে যতসামান্য দৃশ্যমান হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাজনৈতিক দলের তেমন এই বিষয়ে উচ্চবাচ্য দেখা মিলছে না। তবে সাধারণ মানুষের অভিপ্রায়ে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হতে পারে বলে উঠে এসেছে।
সাতক্ষীরা-১ আসনের ভোটার দৈনিক ইত্তেফাকের রাজনীতি ও নির্বাচন বিষয়ক সম্পাদক সাইদুর রহমান বলেন, আমি জীবনে কখনোই ভোট দেইনি। এবার সুযোগ পেয়েছি। দেশের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্রের স্বার্থে বাংলাদেশপন্থিদের আমার জীবনের প্রথম ভোটটি দেবো।
বিগত নির্বাচনে জয়ী যারা
তালা-কলারোয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-১ আসনে বিগত ১২টি সংসদ নির্বাচনে ৫ বার আওয়ামী লীগ, ২ বার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, ২ বার বিএনপি এবং ১ বার জামায়াত, মুসলিম লীগ ও জাতীয় পার্টি ১ বার করে নির্বাচনে জয় পায়।
স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন তালা-ডুমুরিয়া নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের সালাউদ্দিন ইউছুফ নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে মুসলিম লীগের খলিলুর রহমান নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন আওয়ামী লীগের সৈয়দ কামাল বখত সাকি। এ ছাড়া বিএনপির প্রদীপ মজুমদার।
বিএনপিসহ বেশকিছু দলের বর্জনের মুখে ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের সৈয়দ কামাল বখত সাকি নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ অধিকাংশ দলের বর্জনের মুখে অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির সৈয়দ দিদার বখত এ আসনে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন জাসদ (রব) এর আব্দুস সালাম মোড়ল।
সব দলের অংশগ্রহণে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জামায়াতের শেখ আনসার আলী ৭২ হাজার ৬৯২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগের সৈয়দ কামাল বখত পেয়েছিলেন ৬৭ হাজার ০৫৩ ভোট।
অধিকাংশ দলের বর্জনের মুখে ১৫ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৯৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সাতক্ষীরা-১ আসনে নির্বাচিত হন বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব। তিনি পেয়েছিলেন ৩৫ হাজার ৯৮১ ভোট। তার নিকটতম স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির এবিএম আলতাফ হোসেন পেয়েছিলেন ১৬ হাজার ৬২৩ ভোট। একই বছর ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সৈয়দ কামাল বখত সাকি নির্বাচিত হন। সৈয়দ কামাল বখত সাকির মৃত্যুর পর ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিএম নজরুল ইসলাম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সবদলের অংশগ্রহণে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগের শেখ মুজিবুর রহমান পেয়েছিলেন ১ লাখ ১৪ হাজার ৫২৭ ভোট।
সব দলের অংশগ্রহণে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পেয়েছিলেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৯৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪১ হাজার ১৬৪ ভোট।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অধিকাংশ দলের বর্জনের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে ওয়ার্কার্স পাটির অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুৎফুল্লাহ নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনের ভোট রাতেই বাক্সবন্দি করে ফেলে প্রশাসন ও তৎকালীন সরকারি দল। ওই নির্বাচনেও মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে ওয়ার্কার্স পাটির অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুৎফুল্লাহ নির্বাচিত হন।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের বর্জনের মুখে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের ফিরোজ আহম্মেদ স্বপন।
আর এবার ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব নাকি জামায়াতের অধ্যক্ষ মো.ইজ্জত উল্লাহ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন সেটা দেখার অপেক্ষার পালা।