উন্নয়নশীল বিশ্বে কেন অস্থিরতার অবসান হয় না

উন্নয়নশীল তথা তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক হওয়া যেন সুদূর পরাহত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এই সকল দেশের বৈশিষ্ট্য এমন দাঁড়াইয়া গিয়াছে যে, অধিকাংশ সময় নির্বাচন পরিণত হয় প্রহসনে। বিশেষ করিয়া এই সকল দেশে অধিকাংশ সময় সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয় না বলিয়া নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা ও কার্যক্রমে এক ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এই সকল দেশে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে বড় ধরনের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার অভাব দেখা যায়। এক দল বা কিছু দলকে বাদ দিয়া নির্বাচন আয়োজন করিতে গিয়া সেই নির্বাচন অনেক সময় হইয়া পড়ে একতরফা। ফলে রাজনৈতিক সংকট থাকিয়াই যায়। আর ইহাতে সমাজের সকল ক্ষেত্রে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা দুরূহ হইয়া পড়ে।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতির কারণে এই সকল দেশের সমাজে অশান্তি ও অস্থিরতা লাগিয়াই থাকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক বা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকার ক্ষমতায় আসিয়া ১০-২০ বৎসর দোর্দণ্ড প্রতাপে শাসন করিলেও সমাজ ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অবসান হয় না। বরং তাহা আরও শিকড় গাড়িয়া বসে। এই সকল কারণে মুখে যতই উন্নয়ন ও অগ্রগতির ফুলঝুরি ঝরানো হউক না কেন, এই সকল দেশে দারিদ্র্য, অভাব-অনটন, সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি, অর্থনৈতিক লুটপাট-পাচার প্রভৃতি কখনো বন্ধ হয় না। জাতীয় ঐক্য ও পুনর্মিলন (ন্যাশনাল ইউনিটি অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন) নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই সকল দেশ বারংবার ও পদে-পদে হোঁচট খাইতেই থাকে।

পৃথিবীর সকল দেশেই কম আর বেশি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অস্থিরতা আছে। কী ধনী কী গরিব-সকল দেশেই রহিয়াছে কিছু না কিছু সমস্যা। ইহা ভবিষ্যতেও থাকিবে, ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই; কিন্তু উন্নয়নশীল দেশসমূহের সমস্যাসমূহ পৌনঃপুনিকভাবে দৃশ্যমান। ইহা বড়ই অদ্ভুত, বিচিত্র ও বেদনাদায়ক। এই সকল দেশে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটিতে থাকে, চলিতে থাকে। এই জন্য এই সকল দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সঠিক বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারেন না। একটি রাষ্ট্র বা দেশ পরিচালনা করা সহজসাধ্য নহে। ইহার জন্য বিশেষ যোগ্যতা, মেধা ও দক্ষতার প্রয়োজন। সরকার পরিচালনার কাজটি কেবল স্লোগানসর্বস্ব হইতে পারে না; কিন্তু এই সকল দেশে স্লোগান ও চাটুকারিতাই সার হইতেছে। কাজের চাইতে কথার ফল্গুধারা বহিতেছে। দেশ পরিচালনার বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, জনগণের অনেক মৌলিক সমস্যারই তাহারা যথাযথ সমাধান করিতে অপারগ ও অসমর্থ। সকল ক্ষেত্রে গোঁজামিল দিয়া কোনো রকমে ক্ষমতায় টিকিয়া থাকিবার কসরত করা হয়। ইহা করিতে গিয়া তাহারা একসময় কর্তৃত্ববাদীর রূপ ধারণ করেন বা তাহা ধারণ করিতে বাধ্য হন। ভূরাজনীতির চাপে পড়িয়াও তাহারা হইয়া পড়েন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য ও ভারসাম্যহীন। এই জন্য এই সকল দেশে সরকার আসে ও যায়; কিন্তু সমস্যার পাহাড় থাকিয়াই যায়।

গণতন্ত্র হইল স্টেট অব মাইন্ড তথা বিশেষ মন-মানসিকতা বা দৃষ্টিভঙ্গির নামান্তর। ইহার জন্য বিশেষ সফিস্টিকেশন বা পরিশীলন দরকার। ক্ষমতায় গিয়া সর্বদা ব্যক্তিগত, দলীয় বা বিশেষ গোষ্ঠীর উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা লইয়া ধ্যানমগ্ন থাকিলে আমজনতার কল্যাণে নিরলস ও নিরাসক্তভাবে কাজ করা কঠিন। একই ভাবে সমাজের সর্বত্র গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা প্রতিষ্ঠা করাও অসম্ভব বইকি। তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহ এই বিভ্রান্তি ও বিভ্রমের বেড়াজাল হইতে একদিন বাহির হইয়া আসিবে বলিয়া আমরা প্রত্যাশা করি।