জলবায়ু সংকট ও নারীর নিরাপত্তা: রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব নেওয়ার সময় এখনই

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম নতুন করে তাদের কণ্ঠ উঁচু করছে। তাদের স্পষ্ট দাবি—জলবায়ু ন্যায়বিচার, জেন্ডার সমতা এবং তরুণদের অংশগ্রহণকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে আনতে হবে।

উপকূলীয় বরিশাল থেকে শুরু করে পাহাড়ি বান্দরবান পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থী ও তরুণ অধিকারকর্মীরা একত্রিত হয়েছেন ‘জেনারেশন গ্রিন: ভয়েসেস ফর ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স’ উদ্যোগের আওতায়। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়—বাস্তবভিত্তিক ও জেন্ডার-সংবেদনশীল জলবায়ু পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের বাস্তবায়নে এবং সুইডেন দূতাবাসের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের তরুণদের, বিশেষ করে তরুণ নারীদের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তুলে ধরা। ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

জেনারেশন গ্রিন উদ্যোগের অংশ হিসেবে তরুণরা একটি সমন্বিত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছেন, যেখানে জলবায়ু সহনশীলতা, নারীর নিরাপত্তা এবং তরুণ নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

এই উদ্যোগের আওতায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (রংপুর), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (ময়মনসিংহ) এবং বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ে ধারাবাহিক সংলাপ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, তরুণ নেতা ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে প্যানেল আলোচনা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে জলবায়ু অভিযোজন, নারীর নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের অংশগ্রহণের দাবি উঠে আসে।

এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান। স্মারকলিপিতে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, দুর্যোগকালে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিতকরণ, নারী ও শিশুর সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার, নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন কার্যকর এবং নীতিনির্ধারণে তরুণদের প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের দাবি জানানো হয়।

প্রস্তাবনার মূল দিকগুলো

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ও নিরাপদ পরিবেশ
জাতীয় ও স্থানীয় জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় নারী ও শিশু সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি বাধ্যতামূলক করা, উপকূলীয় ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোর জন্য পৃথক বরাদ্দ, স্কুল ও আশ্রয়কেন্দ্রে জেন্ডার-সংবেদনশীল পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রান্তিক ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির দাবি জানানো হয়।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, “দুর্যোগের সময় নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। আশ্রয়কেন্দ্র ও পুনর্বাসন ব্যবস্থায় নারীবান্ধব পরিকল্পনা না থাকলে জলবায়ু সহনশীলতা বাস্তব হবে না।”

নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে শিশু আইন ২০১৩-এর কঠোর প্রয়োগ, অনলাইন জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় স্বতন্ত্র সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং পার্বত্য অঞ্চলে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যটন আইন কার্যকরের দাবি উঠে আসে।

বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, “পার্বত্য অঞ্চলে নারীরা দ্বিগুণ ঝুঁকিতে থাকেন। আইন থাকাই যথেষ্ট নয়—এর কার্যকর প্রয়োগ জরুরি।”

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ
জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শিশু আইন ২০১৩ ও বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন, কিশোরীদের স্কুলে ধরে রাখতে বৃত্তি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, “বাল্যবিবাহ বন্ধে বিয়ের সময় বাধ্যতামূলক বয়স যাচাই ও কার্যকর হটলাইন নিশ্চিত করতে হবে।”

জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু নীতিতে জেন্ডার বাজেটিং নিশ্চিত করা এবং পার্বত্য অঞ্চলে নারীদের সম্পত্তিতে সমান অধিকারের দাবি জানানো হয়।

তরুণ নেতৃত্ব ও সবুজ ভবিষ্যৎ
জলবায়ু নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তরুণদের বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ, পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমে তরুণ নেতৃত্ব এবং শিক্ষাক্রমে পরিবেশ ও জেন্ডার সমতা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠে আসে।
জেনারেশন গ্রিন উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ হাজার তরুণ-তরুণী সরাসরি যুক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই উদ্যোগ ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

নির্বাচনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তরুণদের বার্তা স্পষ্ট—জলবায়ু সহনশীলতা, নারীর নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচার একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তরুণদের মতে, টেকসই পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব শুধু তাদের কথা শুনবে না, বরং নীতি, বাজেট ও বাস্তব ব্যবস্থাপনায় সেই কণ্ঠের প্রতিফলন ঘটাবে।