যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় অগ্রগতির বার্তা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের পরমাণু বিরোধ নিরসনে চলমান আলোচনায় কিছু মূল ‘নির্দেশক নীতিতে’ প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এতে করে চূড়ান্ত চুক্তি খুব শিগগির হচ্ছে—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

জেনেভায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ দফা বৈঠক শেষে ইরানি গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে আরাঘচি বলেন, আলোচনায় বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কিছু মৌলিক নীতির বিষয়ে সাধারণ ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। এই অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা কমিয়েছে—যার প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। তার মন্তব্যের পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক শতাংশের বেশি কমে যায়।

ওমানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ সংলাপ

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে এই আলোচনা সরাসরি নয়, বরং ওমানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর জামাতা জ্যারেড কুশনার আলোচনায় যুক্ত ছিলেন।

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি জানিয়েছেন, এখনো অনেক কাজ বাকি থাকলেও উভয় পক্ষ ‘পরবর্তী পদক্ষেপ’ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে বৈঠক শেষ করেছে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা

আলোচনা শুরুর সময়ই ইরান নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি–এর একটি অংশ সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দেয়, যেখানে দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী মহড়া চালায়। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়। অতীতে হামলার শিকার হলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধের হুমকি দিয়েছে তেহরান—যা বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

শাসন পরিবর্তনের হুঁশিয়ারি ও পাল্টা বার্তা

ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ হতে পারে—এমন মন্তব্যের জবাবে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীকেও এমনভাবে আঘাত করা সম্ভব যে তারা উঠে দাঁড়াতে পারবে না।

অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি পরোক্ষভাবে আলোচনায় যুক্ত আছেন এবং তেহরান চুক্তি করতে চায় বলেই বিশ্বাস করেন।

পরমাণু ইস্যুই আলোচনার কেন্দ্র

ওয়াশিংটন চাইছে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয় আলোচনায় আনতে। কিন্তু তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা শুধু পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়েই কথা বলবে—শর্ত হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি নয় ইরান।

গত বছরের হামলার পর থেকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কার্যত স্থবির হয়ে আছে বলে তারা দাবি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওয়াশিংটন ও তেলআবিব মনে করে, তেহরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে চায়—যদিও ইরান বলছে তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।

নিষেধাজ্ঞা, অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ চাপ

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ও অর্থনীতি চাপে রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশটিতে আন্দোলন হয়েছে, যা কঠোরভাবে দমন করা হয়। ফলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এখন তেহরানের জন্য বড় কূটনৈতিক লক্ষ্য।

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আলোচনার সাফল্য নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র অবাস্তব দাবি থেকে সরে আসে কি না এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে কতটা আন্তরিক থাকে তার ওপর।

আন্তর্জাতিক চুক্তি ও পারমাণবিক বাস্তবতা

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তির সদস্য। এই চুক্তি অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার থাকলেও অস্ত্র তৈরি করা যাবে না এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তদারকি মেনে চলতে হবে।

অন্যদিকে ইসরায়েল এই চুক্তিতে সই করেনি এবং তাদের পারমাণবিক অস্ত্র আছে কি না সে বিষয়ে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বজায় রেখেছে।

‘নতুন সুযোগের জানালা’

জেনেভায় নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে আরাঘচি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে একটি “নতুন সুযোগের জানালা” তৈরি হয়েছে এবং তিনি একটি টেকসই সমাধানের আশা করছেন, যা ইরানের বৈধ অধিকার স্বীকৃতি দেবে।

সব মিলিয়ে, আলোচনায় নীতিগত অগ্রগতি হলেও চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো অনেক দূরের পথ। পরবর্তী ধাপে পারস্পরিক আস্থা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পরমাণু কর্মসূচির সীমা নির্ধারণ—এই তিন বিষয়ই নির্ধারণ করবে ওয়াশিংটন–তেহরান সম্পর্ক নতুন চুক্তির দিকে এগোবে নাকি আবারও অচলাবস্থায় ফিরে যাবে।