অস্ত্র প্রতিযোগিতার নতুন যুগ

তালেব রানা

 

অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণে ১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ও সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ ‘দি ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস ট্রিটি’ বা আইএনএফ চুক্তিতে সই করেছিলেন। দীর্ঘ তিন দশকে এই চুক্তি অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি ছিল। কিন্তু গত শুক্রবার চুক্তিটি থেকে বেরিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তিটির মৃত্যুর জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে তারা।

আইএনএফ চুক্তি অনুযায়ী ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের সব স্বল্প ও মাঝারিপাল্লার পরমাণু ও অপারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। চুক্তির আওতায় ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৭০০ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশ একে অন্যের স্থাপনাও পর্যবেক্ষণ করতে পারত। রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ বিভিন্ন সময় তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা রাশিয়ার বিরুদ্ধে আইএনএফ চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেন। তবে ইউরোপিয়ান নেতারা চাপ দিলেও তিনি চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর পক্ষপাতী ছিলেন না।

চলতি বছরের শুরুতেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপ সীমান্তে নতুন ধরনের ক্রুজ মিসাইল মোতায়েনের মাধ্যমে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ আনে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটও (ন্যাটো)। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, রাশিয়া বেশ কিছু নাইন এম-৭২৯ মিসাইল (যেগুলো ন্যাটোতে এসএসসি-৮ নামে পরিচিত) মোতায়েন করেছে এবং এর প্রমাণ তাদের হাতে আছে। এরপর ন্যাটোও একই অভিযোগ তোলে। যদিও রাশিয়া এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া যদি চুক্তিটা মেনে চলতে না চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসবে। চুক্তির শর্ত মানার জন্য তিনি ২ আগস্ট পর্যন্ত রাশিয়াকে সময়সীমা বেঁধে দেন। ট্রাম্পের এমন ঘোষণার পর এক্ষেত্রে রাশিয়ার যে আপত্তি নেই সেটিও বুঝিয়ে দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী সোভিয়েত যুগে রাশিয়ার সঙ্গে করা গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তিটি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এক বিবৃতিতে চুক্তিটি বিলুপ্তির জন্য রাশিয়াকেই দায়ী করেছেন। তার দাবি, ন্যাটোর পূর্ণ সমর্থন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত হয়েছে যে, রাশিয়া চুক্তি ভঙ্গ করেছে এবং চুক্তির বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে। ন্যাটো মহাসচিব জেনস স্টোলেনবার্গও এজন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপে আইএনএফ চুক্তির আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটেছে। আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিকে সরিয়ে ফেলা হলো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে ৩২ বছর আগে করা চুক্তিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর বিশ্বে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার সামরিক বিশ্লেষক পাভেল ফেলগেনহর বলেছেন, চুক্তিটি শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা নতুন নতুন অস্ত্রের উন্নয়ন ও মোতায়েন দেখব। দেখা যাবে সেই সব অস্ত্র বসানো হচ্ছে একে অন্যকে তাক করে। রাশিয়া এখনই এজন্য তৈরি আছে।

ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, এমন সময় চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে এসেছে যখন রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের মতো মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সক্রিয় নয়। ভূমি থেকে উেক্ষপণযোগ্য টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ মাস সময় লাগবে। আর মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে পাঁচ বছর লাগবে। এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে মস্কো। তারা ধীরভাবে ৯এম৭২৯ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে চলেছে। এখন চুক্তি বাতিল হওয়ায় আরো দ্রুত এ কাজ করতে পারবে।

আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান, থমাস কান্ট্রিম্যানের মতে, রাশিয়ার শর্ত লঙ্ঘনের জবাবে চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে আসার পরে হয়তো এমন পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে, যা আশির দশকে দেখা গেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরকে জবাব দিতে মিসাইল মোতায়েন করেছে।

ওয়াশিংটন এবং মস্কোর এই উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার তুলনায় বেশি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে ইউরোপের নিরাপত্তার ওপর। নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হলে ইউরোপিয়ানরা প্রাথমিকভাবে রাশিয়ার নতুন অস্ত্রের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। বিশেষ করে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রয়েছেন। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে সরব ছিলেন। তারা রুশ হুমকি মোকাবেলায় সবসময় পাশে থেকেছেন। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ন্যাটোতে ইউরোপের দেশগুলোর বরাদ্দ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে চলেছেন।

এমন প্রেক্ষিতে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস সতর্ক করে আন্তর্জাতিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজে বের করতে সব পক্ষকে সমঝোতায় পৌঁছানোর আহবান জানিয়েছেন। যদিও ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি আইএনএফের মতো একটি নতুন চুক্তি করতে চান, যেটিতে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত হবে।  ট্রাম্পের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে সফল হয় কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়।