হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা কি নিশ্ছিদ্র?

এম এ আলআমিন

 

পারস্য উপসাগরে এখন টানটান উত্তেজনা। প্রধান স্পট হরমুজ প্রণালি। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকার মধ্যে প্রধান নৌ-যোগাযোগ রুট এই প্রণালি। তেল আবিষ্কারের আগেও এটি ছিল বিশ্বের উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট। বর্তমানে বিশ্বে মোট তেল বাণিজ্যের ২০ শতাংশ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশ এই প্রণালির মাধ্যমে বাহিত হয়ে থাকে। সবচেয়ে সরু জায়গায় প্রণালিটির প্রস্থ ২১ নটিক্যাল মাইল। সেখানে কয়েকটি ছোটো দ্বীপ রয়েছে। দ্বীপগুলো ওমানের ছিটমহল। পার্বত্য দ্বীপগুলোতে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ বাস করে। ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালিটি পারস্য উপসাগরে ওমান ও ইরানকে সংযুক্ত করেছে। স্বাভাবিক সময়ে এই প্রণালির ভেতর দিয়ে দৈনিক প্রায় দেড় কোটি ব্যারল তেল পরিবাহিত হতো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেত সেই তেল। উল্লেখ্য দক্ষিণ চীন সাগরের মালাক্কা প্রণালি দিয়ে দৈনিক ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারল এবং মিশরের সুয়েজ খাল দিয়ে দৈনিক ৫৫ লাখ ব্যারল তেল রপ্তানি করা হয়ে থাকে। হরমুজ প্রণালি সংকীর্ণ হতে পারে। কিন্তু জ্বালানি তেল বহনে বিশাল বিশাল জাহাজ চলাচলের জন্য এটি যথেষ্ট গভীর এবং চওড়া।

হরমুজ প্রণালি ইরানের জ্বালানি করার তেল রপ্তানির প্রধান রুট। ইরানের অর্থনীতির জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম। দেশটির মোট রপ্তানি আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ আসে জ্বালানি তেল থেকে। ২০১৭ সালে দেশটি ৬ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের তেল রপ্তানি করে। ইরানের ওপর আমেরিকা নতুন করে যেসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তা কেবল ইরানই নয় বরং এর সঙ্গে যেসব দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, তারাও হতাশ হয়েছে। তেহরান বলেছে, তাদের তেল রপ্তানিতে বাধা দিলে উপসাগরীয় অঞ্চলে থেকে কোনো দেশকেই তেল রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হবে। ১৯৮০-এর দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটে। তখন ইরাক ও ইরান পরস্পরের তেল রপ্তানি বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল। তখন জ্বালানি তেল বহনকুারী ২৪০টি তেলের ট্যাংকার আক্রান্ত হয়, ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল ৫৫টি ট্যাংকার। ইরান যদি আবারও সে পথে পা বাড়ায় তখন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তেলের দাম হুহু করে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ যেন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি এলাকাটি টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই এ কাজ করছে। তবে মার্কিন টহল উপসাগরে বিশেষ করে হরমুজের নিরাপত্তা আসলে কতটা নিশ্চিত করতে পারছে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এ ব্যাপারে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ১৯ জুলাই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি ব্রিটিশ তেল ট্যাংকার ‘স্টেনা ইমপেরো’কে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক যান চলাচল আইন অমান্যের জন্য হরমুজ প্রণালি থেকে আটক করে। ইরান জানায়, তেল ট্যাংকারটি জিপিএস বন্ধ রেখেছিল, হরমুজ প্রণালিতে উলটো লাইনে চলছিল ও ধারাবাহিক সতর্ক বার্তা অমান্য করে। সেখানে নৌযান আসা-যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট লাইন রয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ ট্যাংকারটি তার তোয়াক্কা করেনি। ইরানের এ পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে দিন কয়েক আগে জিব্রালটারে একটি ইরানি তেল ট্যাংকার আটকের পালটা প্রতিশোধ হিসেবে। ইরান সরকারের মুখপাত্র আলী রাবিয়ি বলেছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার্থে ব্রিটিশ তেল ট্যাংকার আটক করা হয়েছে। ২৩ জুলাই তেহরানে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারে না। তার দেশের এই পদক্ষেপ পুরোপুরি আইনি ও ন্যায়সংগত বলে তিনি দাবি করেন। সদ্য বিদায়ি ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী টোবিয়াস এলউড (টেরেসা মের কেবিনেট মন্ত্রী) বলেছেন, প্রতিটি নৌযানকে পৃথকভাবে পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়।

ইরান একটি বিষয় স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের একার পক্ষে উপসাগরের চলাচলকারী নৌযানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে তেহরানের সহযোগিতা অবশ্যই লাগবে।