ইফতারি সংস্কৃতিতে মোগল ঐতিহ্য

‘শরবত’ শব্দটি এসেছে ফারসি ‘শারবাত’ থেকে। এর মূল উত্স হলো আরবি শব্দ ‘শারবা’, যার অর্থ হলো ‘এক ঢোক পান করা’ বা ‘পানীয়’। ভাষাগত বিবর্তনে একই মূল শব্দ থেকে বিভিন্ন ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। আভিধানিক অর্থে শরবত বলতে এমন একটি পানীয়কে বোঝায়, যা ফল বা ফুলের পাপড়ির নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টি সিরাপ। প্রাচীন পারস্যে (বর্তমান ইরান) শরবতের উৎপত্তি হয়েছিল। প্রাচীন পারস্যের মানুষ বিভিন্ন ফল এবং ভেষজ দিয়ে তৈরি সিরাপকে ঠাণ্ডা করার জন্য পাহাড়ি বরফ ব্যবহার করত। সেই সময়ে শরবত কেবল তৃষ্ণা মেটানোর জন্য নয়, বরং বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। বিশেষ করে হজমের সমস্যা ও জ্বর সারাতে ভেষজ শরবত দেওয়া হতো।

ভারতে শরবতের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে মোগল সম্রাটদের হাত ধরে। বিশেষ করে প্রথম মোগল সম্রাট বাবর শরবত খুব পছন্দ করতেন। ১৬শ শতাব্দীতে সম্রাটরা উত্তর ভারত ও হিমালয় থেকে দ্রুতগামী ঘোড়ার মাধ্যমে বরফ আনিয়ে শরবত ঠাণ্ডা করতেন, যা ছিল তখনকার সময়ে অত্যন্ত বিলাসবহুল একটি বিষয়। আর মোগল দরবারে আগত অতিথিদের শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করা ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। গোলাপ, চন্দন এবং জাফরানের শরবত তখন সবচেয়ে বেশি সমাদৃত ছিল।

ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের সময় ইউরোপীয়রা মধ্যপ্রাচ্যে এই পানীয়টির সঙ্গে পরিচিত হয় এবং এটি নিজ দেশে নিয়ে যায়। এটিই পরে ইতালিতে ‘সরবিট’ এবং ফ্রান্সে ‘সোরবিট’ হিসেবে বিবর্তিত হয়।

অটোমান সাম্রাজ্যে তুর্কিরা শরবত তৈরিতে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। তারা প্রতিটি খাবারের সঙ্গে হজম সহায়তাকারী হিসেবে বিভিন্ন স্বাদের শরবত পান করত।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, অবিভক্ত বাংলায় ৩০০ বছর রাজত্বের পর মোগলরা আঠারো শতকের শুরুতে ঢাকা ত্যাগ করলেও ইফতারি সংস্কৃতিতে মোগলাই ঐতিহ্য মিশে গিয়েছিল। সে বাঁধন আর যায়নি ছেঁড়া। শতকের পর শতক ধরে ঢাকার নবাবদের মাধ্যমে সেই ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছে অভিজাত শ্রেণি। প্রতি বছর রমজান এলেই পুরান ঢাকার বাহারি সব ইফতারির আয়োজন মোগল আমলের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। বলা যায়, ইফতারের সব উপকরণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্য ধরে রেখেছে মোগলাই শরবত।

সেকালে একেক ধরনের বাদাম দিয়ে তৈরি হতো একেক ধরনের শরবত। যেসব শরবতে মেশানো হতো জাফরান আর দামি সব সুগন্ধি। অসাধারণ স্বাদ আর ঘ্রাণের তৃপ্তিদায়ক সেই শরবতে চুমুক দিয়েই সেকালে রোজাদাররা রোজা ভাঙতেন। মোগল আমলের নবাবদের শরবতের সেই ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা। ‘পেস্তাবাদামের শরবত’ আর ‘শরবত-ই-মহব্বত’ দেখলে বা স্বাদ নিতে গেলে যেন হাজির হয়ে যায় মোগল আমল।

অতি তৃপ্তিদায়ক জনপ্রিয় পেস্তাবাদামের শরবত তৈরিতে সুনাম রয়েছে পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লার পাশের রয়েল হোটেলের। প্রায় দুই দশক ধরে তারা মোগলীয় কায়দায় ‘পেস্তাবাদামের শরবত’ তৈরি করে আসছে। অনেকে বলেন, তাদের পেস্তাবাদামের শরবত কেউ একবার মুখে দিলে তিনি বার বার রয়েলেই ফিরে আসেন। শুধু রয়েলেই নয়, আরও অনেক হোটেল ও জুসবারে তৈরি হচ্ছে পেস্তাবাদামের শরবত। সেগুলোও অনেক জনপ্রিয়।

গতকাল শনিবার বিকালে পুরান ঢাকার লালবাগের হরনাথ ঘোষ রোডে অবস্থিত রয়েল রেস্টুরেন্টের সামনে দেখা গেল এলাহি কাণ্ড। শরবতপ্রেমীদের লম্বা লাইন। ইফতার আইটেমের পাশাপাশি বোতলজাত পেস্তাবাদামের শরবত ছিল অধিকাংশেরই হাতে হাতে।

জানতে চাইলে ‘রয়েল রেস্টুরেন্ট’-এর মালিক মো. জিয়া উদ্দীন ইত্তেফাককে বললেন, ‘দুই দশক আগে দিল্লি গিয়েছিলাম। সেখানে বিশেষ একটি শরবত পান করে বেশ ভালো লাগল। তখন শরবতের রেসিপিটা জানতে চাইলাম, তারা কোনোভাবেই জানাতে চায় না। আমিও নাছোড়বান্দা এবং বললাম, ভাই, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, হোটেল ব্যবসা শুরু করতে চাই। বাংলাদেশে গিয়ে আপনাদের এই চমকপ্রদ রেসিপিটির কথা জানাব। তখন তারা রেসিপির কথা বলতে শুরু করল—দুধ, পেস্তা, জাফরান, চিনির সংমিশ্রণে মালাই বানানো হয়। তারপর ছয় থেকে আট ঘণ্টা ডিপে ফ্রিজিং করাসহ নানা নিয়মকানুন। এরপর তৈরি হয় পেস্তাবাদামের শরবত...।’

শুরুতে রয়েলের পেস্তাবাদামের শরবতের দাম ছিল ১২০ টাকা লিটার। বর্তমানে এক লিটার শরবতের দাম ৩২০ টাকা, লাবাং ২২০ টাকা, বোরহানি ২৫০ টাকা। ডিপ ফ্রিজে সর্বোচ্চ তিন দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায় এই শরবত। সারা বছর পাওয়া গেলেও রমজানে এই শরবতের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। এ সময় প্রতিদিন ১৫০ থেকে ৩০০ লিটার পর্যন্ত এই শরবত বিক্রি হয় বলে জানান জিয়াউদ্দিন।

শরবত কিনতে আসা পুরান ঢাকার বাসিন্দা শিশির আহমেদ বলেন, ‘পেস্তার শরবত অনেক জায়গায় পাওয়া গেলেও রয়েলেরটা সবচেয়ে বেস্ট। দীর্ঘদিন ধরেই আমি রয়েলের পেস্তাবাদামের শরবতের ক্রেতা। এই শরবত ছাড়া আমার পরিবারের ইফতার অসম্পূর্ণ।’

লালবাগ চৌরাস্তার কাছেই লালবাগ শাহি জামে মসজিদের বিপরীতে গিয়ে দেখা মেলে শাহি জুস কর্নারের। ছোট্ট দোকান ‘শাহি জুস কর্নার’। ভেতরে দাঁড়ানোর জায়গাও তেমন নেই। একটা মাত্র বেঞ্চ পাতা। রমজানে ইফতারের আগে বসে খাওয়া নিষেধ সেখানে।

শাহি জুস কর্নারের বিক্রয়প্রতিনিধি চন্দন জানাল, ‘রোজা এলেও আমাদের সব জুসের দাম আগের দামেই বিক্রি করছি। শাহি জুস কর্নারে ৮০ রকমের জুস পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে জলপাই জুস থেকে জিরা পানি, লেমন মিন্ট, কাচা আম, তরমুজ ৩০ টাকা, আপেল, আনারস, পেঁপে, আঙুর, কদবেল, জাম, পেয়ারা, ৪০ থেকে ৫০টাকা এছাড়া পেস্তা মিল্ক শেক, এভাকাডা মিল্ক শেক, ড্রাগন ফ্রুট জুস, পার্সিমন মিল্ক শেক ১০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এখানকার শরবতের মধ্যে বেশি চাহিদা খেজুর মিল্কশেক, পেস্তা মিল্কশেক, জাম আর জলপাইয়ের জুসের। শরবতপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ মহব্বতকা শরবত আর অ্যারাবিয়ান শরবত। ড্রাগন ফল, দুধ, তরমুজকুঁচি আর কাঠবাদাম কুঁচি দিয়ে জনপ্রিয় এই শরবত তৈরি করছে নাজিরাবাজার চৌরাস্তার ‘আল-কারীম জুসবার’। এখানে কাশ্মীরি আর স্পেশাল ফালুদাও পাওয়া যাচ্ছে। লেবুর শরবত দিয়ে ১৯২২ সালে পথচলা শুরু করেছিল রায়সাহেব বাজার মোড়ের ‘বিউটি লাচ্ছি’। শতবর্ষী বিউটির লেবুর শরবত এখনো সমান জনপ্রিয়।

পুরান ঢাকার চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী দোকান নূরানী কোল্ড ড্রিংকসের লাচ্ছির কদর রয়েছে মানুষের মুখে মুখে। প্রায় ৫০-৬০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি লাচ্ছি বানিয়ে আসছে। বিয়ে-জন্মদিন থেকে শুরু করে সামাজিক অনুষ্ঠানে ডাক পড়ে নূরানীর লাচ্ছির। নূরানীর স্পেশাল লাচ্ছি ৩০ টাকা ও লেবুর শরবত মিলবে ১৫ টাকায়।

পুরান ঢাকা ছাড়াও হাতিরপুলে মোতালেব প্লাজার নিচতলায় ‘শেক ইট ফার্স্ট’ একাই যেন ১০০। তরমুজ, আঙুর, এভাকাডো, পেস্তাবাদাম, মিক্স বাদাম শেক, কাজু শেকসহ ভিন্নধর্মী অর্ধশতাধিক জুস রয়েছে। যেখানে বিশেষ করে তরুণরাই বড়শিগাঁথা মাছের মতো ঘিরে থাকে সকাল থেকে রাত অবধি। ‘শেক ইট ফার্স্ট’-এর বিক্রয়-প্রতিনিধি মো. মোতালিব ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা ক্রেতাদের সব সময় ফ্রেশ ফলের জুস দেওয়ার চেষ্টা করি। এক্ষেত্রে আমাদের সততা শতভাগ। যে কারণে এখানে ভিড় বেশি। রমজানে চাহিদা অনেক বেশি। বসার জায়গা দেওয়া না। এখানে কেবল তরুণরাই নয়, অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে আসেন। একেক আইটেমের দাম একেকরকম। ৩০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম।’