ইরান যখন উপসাগরী দেশগুলোতে একের পর এক মার্কিন ঘাঁটি এবং তাদের শহরে হামলা চালায় তখন সরকারগুলোও চুপ ছিল। তারা যুদ্ধ এড়াতে নিন্দা ছাড়া আর কিছুই বলেনি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বলছে, ইরানের হামলা অব্যাহত থাকায় এখন হয়তো ছয়টি দেশ পালটা হামলা চালাতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে। কেবল উপসাগরীয় দেশগুলোই নয়, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানিও মিত্র দেশগুলোর সমর্থনে ইরানে পালটা হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।
ইরানে চালানো যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সামরিক অভিযান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ ধরে ইরানে হামলা অব্যাহত থাকবে। এর আগের দিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় রাজি হওয়ার কথা বললেও গতকাল সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেন। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলি লারিজানি জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনায় যাবে না তেহরান। যদিও ইরাকের মতো ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। সেইসঙ্গে ইরানি জনগণ এই ‘অবিশ্বাস্য সুযোগ’ কাজে লাগাবে বলে আশা করছেন তিনি।
যুদ্ধে জড়াবে মধ্যপ্রাচ্য: পশ্চিম এশিয়ার আরো এক দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার পর ইরানের বন্ধু গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা শুরু করে। লেবানন সরকার তাদের পদক্ষেপকে সমর্থন করেনি। তবে হিজবুল্লাহ ছাড় দিতে রাজি নয়। নেতানিয়াহুর বাহিনীও প্রত্যাঘাত শুরু করেছে। ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ৩১ জন নিহত হয়েছে। গত শনিবার ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল এবং মার্কিন বাহিনী। প্রথম দফার হামলায় নিহত হন খামেনি। চিকিত্সাধীন অবস্থায় গতকাল মারা যান খামেনির স্ত্রীও। রবিবার সকালে ইরানের সরকারি সংবাদসংস্থা খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করতেই পশ্চিম এশিয়ায় উত্তাপ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। যৌথ বাহিনীর হামলার প্রতিবাদে ইরানও পালটা পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশে হামলা চালায়। বোমা ফেলা হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতারের মতো দেশের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে। বুর্জ খলিফাও খালি করে দিতে হয়েছে। বোমা পড়েছে দুবাই বিমানবন্দরে। গতকাল সৌদি আরব ও কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এর আগের দিন বাহরাইন এবং জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। রবিবার উপসাগরীয় ছয় দেশ বৈঠকে বসে।
গতকাল যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয়টি মিত্র দেশের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ঐ সব অঞ্চলে ইরানের পদক্ষেপ খুবই বিপজ্জনক। যা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ঐ বিবৃতিতে বলা হয়, বেসামরিক নাগরিক ও যে সব দেশ যুদ্ধে নেই তাদেরও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে। যা দেশগুলোর স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি কারণ। আরবি ভাষায় প্রকাশিত এই যৌথ বিবৃতিটি দিয়েছে কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাষ্ট্র। তারা বলেছে, এই অঞ্চলে ইরানের হামলা চলতে থাকলে তাদেরও আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। এই বিবৃতিতে জানানো হয়, বাহরাইন, ইরাক (ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলসহ), জর্ডান, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা সংঘটিত হয়েছে।
হামলা বন্ধ করবেন না ট্রাম্প, সহায়তা করবে পশ্চিমা মিত্ররা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ অভিযান পূর্ণ শক্তিতে অব্যাহত থাকবে এবং আমাদের সকল লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। ভিডিও বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে আরো বেশি মার্কিন সেনা হতাহতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেইসঙ্গে তিনি এও উল্লেখ করেন, এটাই একমাত্র পথ। যুক্তরাষ্ট্র তাদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে এবং সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা সন্ত্রাসীদের ওপর সবচেয়ে শাস্তিমূলক আঘাত করবে। তিনি আরো বলেন, ‘আমি আবারও রেভুলেউশনারি গার্ডস, ইরানি মিলিটারি পুলিশকে তাদের অস্ত্র সমর্পণ করতে এবং সম্পূর্ণ দায়মুক্তি পাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি’। তিনি সতর্ক করেন, নতুবা নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। এটি নিশ্চিত মৃত্যু হবে, এটি সুন্দর হবে না। মার্কিন প্রশাসনের সূত্রের বরাত দিয়ে জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, ইরানের সরকার পতন না হওয়া পর্যন্ত হামলা অব্যাহত রাখবেন ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, যদি দরকার হয় ইরানে আরো চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ হামলা চালানো হতে পারে। তাতে আমেরিকার কোনো সমস্যা হবে না। তার দাবি, ইরানের নেতা হিসাবে তিন জনকে তিনি ভেবে রেখেছেন। তবে কীভাবে ইরানের শাসনভার হস্তান্তর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গতকালই যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। এই তিনটি রাষ্ট্র এক যৌথ বিবৃতিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের বাছবিচারহীনভাবে এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ও তাদের মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়ে বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘আমরা আমাদের এবং এই অঞ্চলে আমাদের মিত্রদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য পদক্ষেপ নেব। প্রয়োজনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের সক্ষমতা তাদের উত্সমুখেই ধ্বংস করতে প্রয়োজনীয় ও সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে আমরা প্রস্তুত।’ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমার জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটি থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
সতর্ক অবস্থানে জিসিসি
উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তবে কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জসিম বিন জাবের আল থানি এক্সে এক পোস্টে সতর্ক করে বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) রাষ্ট্রগুলোর ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া উচিত নয়। যদিও তেহরান রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে। শেখ হামাদ লিখেছেন, এমন কিছু শক্তি আছে যারা চায় রাষ্ট্রগুলো ইরানের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়ুক। ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ হলে উভয় পক্ষের সম্পদ হ্রাস পাবে এবং সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার অজুহাতে অনেক শক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পাবে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাত্রা এবং সময় নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সৌদি আরব। তেহরান বা তার মিত্রদের (প্রক্সি) পক্ষ থেকে বড় ধরনের কোনো পালটা জবাব এড়াতে এবং অঞ্চলটিকে একটি ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ধাবিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে রিয়াদ। তবে সৌদি আরব এবং জিসিসিভুক্ত দেশগুলো সতর্ক থাকলেও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করবে না বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলি লারিজানি। ওমানের মধ্যস্থতার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা বসার বিষয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় লারিজানি ঐ কথা জানিয়েছেন। তিনি এক্সে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করব না।