ঘর থেকে এনে মিলিকে মিলি বানিয়েছেন ছোটন

এশিয়ান কাপ নারী ফুটবলে গোলপোস্টে থাকার কথা ছিল সাফ চ্যাম্পিয়ন রূপনা চাকমার। তিনি সাফের সেরা গোলরক্ষক। অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে নামানোর প্রশ্নই আসে না। কিন্তু ম্যাচের দিন চমকে দিয়েছেন নারী ফুটবল দলের কোচ পিটার জেমস বাটলার। রূপনাকে ছেটে ফেলে অখ্যাত গোলরক্ষক মিলি আক্তারকে একাদশে নামিয়ে। মিলি তার ফুটবল ক্যারিয়ারে একটা মাত্র আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন। তার ওপর কীভাবে কোচ নির্ভর করলেন সেটি বলা কঠিন। তবে আশঙ্কা ছিল মিলি চীনের বিপক্ষে ম্যাচে ভুল করে দলকে ডুবিয়ে দেন কি না।

মিলি অসাধারণ ফুটবল খেলেছেন। চীনের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। হালকা পাতলা গড়নের মিলির সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল রূপনার চেয়ে তিনি উচ্চতায় একটু বেশি। তবে খেলা দেখে বেশি। মনে হয়নি দক্ষতাসম্পন্ন। চীনের বিপক্ষে পরশু দুপুরে প্রথম ম্যাচে ২-০ গোলে হেরেছে বাংলাদেশ। এই হার খাতা-কলমে লেখা থাকবে। কিন্তু স্কোর লাইনটা একপাশে সরিয়ে রাখলে ম্যাচের অনেকাংশ জুড়ে বাংলাদেশের জন্য বিরাট একটা গল্পই বলা যায়। 

চীন এশিয়া কাপের ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন, বিশ্বকাপ খেলা দেশ। তাদের ঘরে অভিজ্ঞ ফুটবলারের শেষ নেই। ভাণ্ডার বলতে হয়। সেই দলের আক্রমণের বিপরীতে বাংলাদেশের গোলরক্ষক লেজেগোবরে হয়ে যাবে সেটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। মিলি সেই কুৎসিত গল্প লেখার সুযোগ দেননি। দারুণ খেলেছেন তিনি। ছিপিছিপে শরীরের মেয়ে উড়ন্ত বলে কিংবা ড্রাইভিংয়ে সবদিক থেকে পারদর্শি ছিলেন। তার খেলার প্রশংসা সবার মুখে মুখে। 

ময়মনসিংহের নান্দাইলের মেয়ে মিলি আক্তার। একটা সময় বাফুফের ক্যাম্পে ছিলেন। কি একটা কারণে তাকে ক্যাম্প ছাড়তে হয়েছিল। গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। ফুটবল ক্যারিয়ার অন্ধকারে। স্বপ্ন ছিল ফুটবলে ক্যারিয়ার গড়বেন। কিন্তু ভাগ্য ভালো ছিল না। বাফুফের ক্যাম্প ছাড়তে হয়েছিল। কিন্তু নাছোড়বান্দা মিলি। গ্রামে গিয়ে বসে থাকেননি। একা একা অনুশীলন করছিলেন। ভেতরের স্বপ্ন ভেতরেই মরে যেতে দেবন না, স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। 

একটা ফোন মিলিকে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছিল। কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন, বাফুফেতে নেই। তখন সেনাবাহিনীর কোচ হলেন। প্রথমবার সেনাবাহিনী নারী ফুটবল দল গঠন করেছে। দলে ভালো গোলরক্ষক ছিল না। সামনে বিকেএসপির বিপক্ষে ম্যাচ। ছোটনের চোখে নড়বড়ে গোলপোস্ট। 'আমি দেখলাম আমার গোলরক্ষক দরকার। বিকেএসপির বিপক্ষে ম্যাচ দেখতে আসবেন সেনাবাহিনীর প্রধান। সেই সময় আমি মিলিকে ফোন করলাম। মিলি গ্রামের বাড়িতে। ডেকে আনলাম ঢাকায়। তারপর থেকে মিলি সেনাবাহিনীতে খেলছে। নিয়মিত ম্যাচ খেলেছে-বললেন ছোটন। তার খুব গর্ব হয় মিলিকে নিয়ে। তখন যদি মিলিকে ডেকে না আনতেন তাহলে হয়তো এখন মিলি আজকের এশিয়ান কাপে খেলার জায়গা পেত কি না কে জানে। তবে ছোটন যে একটা মহৎ কাজ করেছেন সেটা তো নিশ্চিত।

ছোটন স্বীকার করুক না করুক-মিলিকে উপহার দিয়েছেন তিনি। মিলিকে তৈরি করেছেন সেনাবাহিনীতে রেখে। তার নিয়মিত লিগের ম্যাচ খেলে মিলি আক্তার গোলপোস্টের নিচে আস্থার প্রতীক হলেন, সেটা দেখলেন কোচ পিটার বাটলার। দলে নিলেন। নিয়ে গেলেন এশিয়া কাপে। অসাধারণ পারফরম্যান্স করলেন। দেশের মানুষ দেখল দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। বাহাবা দিলেন সবাই। বুকটা ভরে গেল ছোটনের। 'মনে হচ্ছে দেশের জন্য কিছু করেছি।' সেনাবাহিনীও গর্ব করতে পারে মিলি তাদের ওখান থেকে নতুন জীবন পেয়েছেন।