সিলেটে খরতাপে পুড়ছে চা বাগান, বৃষ্টির অভাবে বের হচ্ছে না ‘কুড়ি’

আকাশে মেঘের আনাগোনা থাকলেও সিলেট অঞ্চলে এখনো বৃষ্টির দেখা নেই। তীব্র খরতাপে সবুজ চা বাগানগুলো বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিকেলের তপ্ত রোদে টিলাভূমির বেলে মাটি গরম হয়ে চা গাছের কচি পাতা পুড়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোমবার (৯ মার্চ) দুপুরে সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ মোহাম্মদ সজিব হোসেন বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও এখনো সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টি হয়নি। আকাশে মেঘ থাকলেও কখন বৃষ্টি হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তিনি জানান, বৃষ্টির অভাবে শুধু চা বাগান নয়, ফসলের মাঠেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হাওরপাড়ের অনেক মানুষ খোলা মাঠে বৃষ্টির জন্য মোনাজাত করছেন।

সিলেটের একটি চা বাগানের ম্যানেজার কামরুজ্জামান চৌধূরী বলেন, বাগানগুলোতে বর্তমানে ‘হট স্লোপ’ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। তার ভাষায়, বিকেলের তীব্র রোদে টিলাভূমির বেলে মাটি গরম হয়ে যাচ্ছে। ফলে চা গাছের সবুজ পাতা বিবর্ণ হয়ে পড়ছে এবং কচি কুঁড়ি বের হচ্ছে না।

সাধারণত ফেব্রুয়ারির শেষ বা মার্চের শুরুতে যে বৃষ্টি হয়, তা চা শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের বৃষ্টি চা গাছে নতুন কুঁড়ি বের হওয়ার জন্য সহায়ক। কিন্তু বৃষ্টির অভাবে এবার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিলেট অঞ্চলের ১৩৪টি চা বাগানের ব্যবস্থাপকরা এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

চা বাগান সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে প্রোনিং বা ছাঁটাই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চা পাতা উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়। এরপর বৃষ্টি হলেই নতুন কুঁড়ি গজাতে শুরু করে এবং পাতা তোলা শুরু হয়।

খরা মোকাবিলায় কিছু বাগানে পাইপের মাধ্যমে পানি ছিটানো হলেও বেশিরভাগ বাগানেই সেই ব্যবস্থা নেই। ফলে বৃষ্টির অপেক্ষায় দিন গুনছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জন্য দেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ কোটি ৩০ লাখ কেজি। কিন্তু বছর শেষে উৎপাদন হয়েছে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার কেজি।

অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮০ লাখ কেজি কম চা উৎপাদন হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের তুলনায় উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪ সালে মোট উৎপাদন ছিল ৯ কোটি ৩০ লাখ ৪২ হাজার কেজি।

চা বোর্ডের শ্রীমঙ্গল প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিট সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে মোট ১৭১টি চা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজারে সর্বাধিক ৯০টি, হবিগঞ্জে ২৫টি, চট্টগ্রামে ২২টি, সিলেটে ১৯টি, পঞ্চগড়ে ১০টি, রাঙামাটিতে দুটি এবং ঠাকুরগাঁওয়ে একটি বাগান রয়েছে।

নার্সারিসহ দেশে মোট চা চাষাধীন জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৪১ একর।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিশেষজ্ঞের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে দেশে আরও প্রায় ১ কোটি কেজি বেশি চা উৎপাদন সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে বাংলাদেশের চা শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে।