দেশে বাল্যবিয়ে, জন্মনিরোধক সামগ্রীর সংকট, লোকবলের সংকটে—বাড়ছে অনাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এবং জন্মহার। জন্মহার যেখানে ২ দশমিক ৩ থেকে কমিয়ে ২ নামিয়ে আনার কথা, সেখানে জন্মহার বেড়ে ২ দশমিক ৪-এ পৌঁছে গেছে, যা আমাদের দেশের জন্য উদ্বেগের বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত এক-দেড় বছরে সরকারি সরবরাহ না থাকায় সবধরনের জন্মনিরোধক সামগ্রীর সংকট রয়েছে মাঠ পর্যায়ে। ফলে অনিচ্ছাকৃত বা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বাড়ছে। সারা দেশে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে পাঁচ ধরনের জন্মনিরোধক সরবরাহ করে সরকার। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গর্ভনিরোধক সামগ্রী—আইইউডি (ইন্ট্রা ইউটারিন ডিভাইসেস), ইনজেকশন এবং ইমপ্ল্যান্ট বিনা মূল্যে দিয়ে থাকে সরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান এই সংকট জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে এমন একসময়ে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যখন গত পাঁচ দশকের মধ্যে দেশে প্রথম বারের মতো মোট প্রজনন হার (টিএফআর) বেড়েছে।
এমসিএইচ সার্ভিসেস ইউনিটের পরিচালক ডা. নাছির আহমদ সংকটের কথা তুলে ধরে ইত্তেফাককে বলেন, ‘গত দেড় বছর যাবৎ আমাদের কনটাসেপ্টি, লজিস্টিক সাপোর্ট ছিল না—জন্মহার বাড়ার এটা একটা কারণ হতে পারে। তবে গত ১০ বছর আমাদের টিএফআর একই রকম ছিল ২ দশমিক ৩ ছিল’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের কর্মীসংকট আছে, দীর্ঘমেয়াদি মেথড যেগুলো, সেসব নেই—এসব কারণেও টিএফআর বাড়তে পারে। এসব ঠিক হয়ে এলে হয়তো জন্মহার কমে আসবে। তবে তিনি জানান যে, একটা ব্রেক হয়ে গেলে সেটা আবার পূর্বের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে একটু সময় লাগবে।
গত বছর নভেম্বর প্রকাশিত ‘মালটিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ (মিকস)’-এর ফল প্রকাশের পর এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সামনে আসে। জরিপে দেখা গেছে, প্রজনন হার (টিএফআর) ২০১৯ সালের ছিল ২ দশমিক ৩, এই হার বেড়ে হয়েছে ২ দশমিক ৪। জরিপে আরো জানা যায় যে, জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার এবং আধুনিক পদ্ধতির সুবিধা পাওয়ার সুযোগ—দুটোই কমেছে। এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, জন্মনিরোধকসামগ্রীর সংকটের সঙ্গে প্রজনন হার বাড়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
কারণ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশ সরকারি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, তাই সরবরাহ কমে যাওয়া জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউনিসেফের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি বিবাহিত নারীদের জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ দেখা গিয়েছিল, ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ। সেখান থেকে কমে এখন ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। আধুনিক জন্মনিরোধক পদ্ধতির চাহিদা পূরণের হারও ৭৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক ইত্তেফাককে বলেন, জন্মহার বাড়ার জন্য অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করে। এর মধ্যে বাল্যবিয়ে, দারিদ্র্য—এই ফ্যান্টরগুলো যখন কাজ করে, তখন জন্মহারটা কমে আসে। যেমন হঠাৎ করে যদি দারিদ্র্য বেড়ে যায়, যদি বাল্যবিয়ে বেড়ে যায়, তাহলে জন্মহারটা বেড়ে যাবে।
অধ্যাপক আমিনুল হক বলেন, ‘আমাদের দেশের ৬ কোটি সক্ষম দম্পতি আছে। তাদের গড়ে দুটা সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা, সেখানে তারা যদি ২.৪ সন্তান জন্ম দেয়, তাহলে সেটা আমাদের দেশের জন্য অনেক বেশি এবং আমাদের আনম্যানেজেবল সাইজ হয়ে যাবে। আমাদের জন্মহার নিচের দিকে যাওয়ার কথা ছিল; তা না হয়ে যাচ্ছে ওপরের দিকে, তাহলে সেটা তো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবেই। এখন দেখতে হবে কোন ধরনের মানুষের মধ্যে এর প্রভাব বেশি পড়ছে। গ্রামে না শহরে, কিংবা বস্তিতে কোথায় বেশি—সেই জায়গাগুলো চিহ্নিক বরে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫৩ লাখ নারী গর্ভধারণ করেন। এর মধ্যে ৩৩ থেকে ৩৪ লাখ নারী সন্তান জন্মদান করে। বাকি নারীদের গর্ভপাত হয়। যা প্রায় ১৯ লাখের মতো।
এমসিএইচ সার্ভিসেস ইউনিটের উপপরিচালক ডা. আ ন ম মোস্তফা কামাল মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, ‘জন্মহার আমাদের কমতির দিকেই ছিল। তবে গত ১০ বছর আমাদের জন্মহার (টিএফআর) ২ দশমিক ৩ ছিল। শুধু লজিস্টিক সাপলাই না থাকার কারণে এক দেড় বছরে জন্মহার ২ দশমিক ৪ হয়ে গেল।’ তবে এই কর্মকর্তা জানান—‘এখনো আমাদের জনগণ সচেতন না। দেশের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মানুষ বিদেশ থাকে। তারা দেশে আসে আবার যায়, তারা পরিকল্পিত গর্ভধারণ করতে পারে না। এখানে কিছু অপরিকল্পিত সন্তানের জন্ম হয়।’