বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও মডেলদের অপেশাদার এবং উদ্ধত আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে এক পথচারীকে রাশিয়ান বংশোদ্ভূত মডেলের মারধর এবং আরেক জনপ্রিয় বিদেশি ইনফ্লুয়েন্সারের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, রাজধানীর গুলশান এভিনিউয়ের ব্যস্ত সড়কে এক পথচারীকে রাশিয়ান বংশোদ্ভূত মডেল মনিকা কবির নির্দয়ভাবে পেটাচ্ছেন।
জানা যায়, মারধরের এই ভিডিওটি মনিকা নিজেই সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে আপলোড করেছেন।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গুলশানের ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি আটকে থাকা অবস্থায় এক পথচারী কাঁধে ব্যাগ নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। এ সময় অসাবধানতাবশত তার ব্যাগটি মনিকার কনুইয়ে লাগে। তুচ্ছ এই ঘটনায় প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মনিকা। তিনি গাড়ি থেকে নেমে বা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ওই ব্যক্তিকে ধাক্কা দেন এবং নিজের ব্যাগ দিয়ে বারবার আঘাত করতে থাকেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, বেশ কিছু সময় ধরে প্রকাশ্যে রাস্তায় ওই ব্যক্তিকে হেনস্তা করা হলেও আশপাশের কেউ প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেননি।
এই ঘটনাটি নিয়ে ইতোমধ্যে নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ মানুষ একে ‘বিদেশি নাগরিকদের উদ্ধত আচরণ’ হিসেবে দেখলেও, একাংশের দাবি- ওই পথচারী কোনো অশোভন ইঙ্গিত করায় মডেল এমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
তবে সচেতন নাগরিকদের মতে, কারণ যাই হোক না কেন, দেশের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং প্রকাশ্য দিবালোকে একজনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা চরম ধৃষ্টতার শামিল। কেবল ব্যক্তিগত আচরণ নয়, বিদেশি ইনফ্লুয়েন্সারদের বাংলাদেশে কাজ করার আইনি প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক দানা বাঁধছে। এক্ষেত্রে বারবার আলোচনায় আসছে ‘অ্যালেক্স টাকলা’ নামে পরিচিত আরেক বিদেশি ইনফ্লুয়েন্সারের নাম। দেশের বিভিন্ন বড় বড় ব্র্যান্ডের প্রমোশন এবং বাণিজ্যিক অনুষ্ঠানে তাকে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন, এই বিদেশি নাগরিকরা কোন ধরনের ভিসায় বাংলাদেশে অবস্থান করছেন? টুরিস্ট ভিসায় এসে এ দেশে নিয়মিত বাণিজ্যিক কাজ বা অর্থ উপার্জন করা আইনত দণ্ডনীয়। সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ড বা আয়োজক কর্তৃপক্ষ তাদের দিয়ে কাজ করানোর ক্ষেত্রে ওয়ার্ক পারমিট বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। যথাযথ ট্যাক্স না দিয়ে বা নিয়ম না মেনে এই ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম দেশের অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর।
বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের আতিথেয়তা দেওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। তবে এর সুযোগ নিয়ে স্থানীয় নাগরিকদের হেনস্তা করা বা দেশের আইনকে তোয়াক্কা না করার প্রবণতা উদ্বেগজনক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জাহিদ হোসাইন খান বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় সস্তা জনপ্রিয়তার নেশায় অনেকে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। এই পরিস্থিতিতে রাজধানীর নিরাপত্তা ও আইনি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিদেশি নাগরিকদের মুভমেন্ট এবং তাদের পেশাদার কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। গুলশানের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় পথচারী লাঞ্ছনার ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপকর্ম আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।