দুই দিনে পদ্মার তীররক্ষা প্রকল্পের ১৩ হাজার জিওব্যাগ লুট

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরভাগা এলাকায় চলমান পদ্মা নদীর তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য রাখা বালুভর্তি জিও ব্যাগ লুটের অভিযোগ উঠেছে। শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দিনে প্রকল্প এলাকাটি থেকে ১৩ হাজার ৫৪৬টি জিও ব্যাগ লুট হয়েছে এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় এক কোটি টাকা।

বৃহস্পতিবার (৬ মার্চ) ও শুক্রবার দুই দিনে এ লুটের ঘটনা ঘটে। এতে ২২ নম্বর প্যাকেজ প্রকল্পের ১৩ হাজার ৫৪৬টি জিওব্যাগ লুট করে নেয় স্থানীয়রা। এ ঘটনায় শুক্রবার সাব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঈগল রিচ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন বিডি লিমিটেডের পক্ষ থেকে ভেদরগঞ্জের সখিপুর থানায় জিডি করা হয়।

শরীয়তপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান জিও ব্যাগ লুটপাটের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, কিছু দুষ্কৃতিকারী তীর রক্ষা বাঁধের জিওব্যাগ লুটপাট করেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে পাউবোর কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গেলে দুষ্কৃতিকারীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওই কর্মকর্তাকে ধাওয়া দেয়। পরে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে, তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।

তিনি আরও বলেন, ‘সরজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা যায় সেখানে বালুভর্তি ১৮-১২ হাজার ব্যাগ ছিল। যার মধ্যে অন্তত সাড়ে ১৩ হাজারের বেশি জিও ব্যাগ দুষ্কৃতিকারীরা নিয়ে গেছে। পরে বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়। ঘটনাস্থল এলাকায় মাইকিং করি যাতে সরকারি সম্পত্তি কেউ বিনষ্ট না করে। আমার চাকরির লাইফে এমন ঘটনা দেখিনি। এই নজিরবিহীন ঘটনাটি কেন ঘটেছে স্থানীয়রা ভালো বলতে পারবেন।’

স্থানীয়দের তথ্য অনুসারে, পদ্মা নদীর ডান তীরের উপজেলার মনাই হাওলাদার কান্দি ও আশপাশের গ্রামের কয়েকশ মানুষ সরকারি সিলযুক্ত জিওব্যাগগুলো থেকে বালু ফেলে এসব জিও ব্যাগ নিয়ে যান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ (ইঞ্জিনিয়ার ও ঠিকাদারের) নির্দেশনাতেই এইসব জিওব্যাগ নিয়ে গেছেন স্থানীয়রা।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, শরীয়তপুর পদ্মা ও মেঘনা নদী বেষ্টিত এলাকা। কৃষি কাজের পাশাপাশি এই এলাকার মানুষ গুলোর বড় একটি আয় আসে নদী থেকে মৎস্য আহরণের মধ্য দিয়ে। তাই নদীর পারেই এলাকার মানুষের বসবাস। নদীবেষ্টিত হওয়ায় জেলাটি ভাঙনপ্রবণ। বর্ষাকাল এলেই এখানে ভাঙন শুরু হয়। জেলার জাজিরা, নড়িয়া, গোসাইরহাট ও ভেদরগঞ্জ উপজেলা পদ্মা নদীর তীরসংলগ্ন। এদিকে ভেদরগঞ্জ উপজেলার নদীতীরবর্তী চরভাগা ও তারাবুনিয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ভাঙন প্রবণ হওয়ায় নদীর দক্ষিণ তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়।

ওই দুটি ইউনিয়নের ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার এলাকায় নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ২০২৩ সালে ৩০টি গুচ্ছ প্রকল্প (প্যাকেজ) এর মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয় ৫৭০ কোটি টাকা। প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। চরভাগা ইউনিয়নের মনাই হাওলাদার কান্দি এলাকায় প্রকল্পের ২২ নম্বর প্যাকেজে ২২০ মিটার এলাকায় নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ পায় নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ। তারা ঈগল রিচ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন বিডি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে সাব-ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে কাজটি বাস্তবায়ন করছে। 

ওই প্যাকেজের (২২০ মিটার অংশ) কাজে ৭৮ হাজার ৯৫৩টি বালুভর্তি জিওব্যাগ এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার ৯০৯টি সিসি ব্লক ব্যবহার করা হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বালুভর্তি জিওব্যাগ ও সিসি ব্লক ব্যবহারের কাজ করছেন। এমন অবস্থায় গত ৬ ও ৭ মার্চ প্রকল্প এলাকায় রাখা বালুভর্তি জিওব্যাগ লুট হওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই দুই দিনে স্থানীয় বিভিন্ন এলাকার কয়েকশ মানুষ প্রকল্প এলাকায় থাকা জিওব্যাগ থেকে বালু ফেলে ব্যাগগুলো নিয়ে যায়। প্রকল্প এলাকা থেকে ১৩ হাজার ৫৪৬টি জিওব্যাগ লুট করা হয়, যাতে প্রকল্পের অন্তত এক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঈগল রিচ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন বিডি লিমিটেডের প্রকৌশলী মোহাম্মদ লোকমানকে ফোন দিলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এজন্য তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া ঘটনার পর থেকে তিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে জানা গেছে। 

লোকমানের অনুপস্থিতিতে ২২ নম্বর প্যাকেজের দায়িত্বে রয়েছেন একই প্রতিষ্ঠানের ১৮ নম্বর প্যাকেজের প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম। এই ঘটনাটি কেন ঘটেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে স্থানীয়রা এসে বালু ভর্তি ব্যাগ কেটে বালু ফেলে দিয়ে জিওব্যাগ লুট করে নিয়ে যায়। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং পুলিশের সহযোগিতায় সেই লুটপাট বন্ধ করা হয়।’

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন ঠিকাদারের যোগসাজশে স্থানীয়রা এই সব জিওব্যাগ নিয়ে গেছেন। এই বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে, প্রশ্নটি তিনি এড়িয়ে গিয়ে বলেন এই বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।

স্থানীয় বাসিন্দা মিয়াজুল মোল্লার ছেলে আলী হোসেন মোল্লা (৩৫) বলেন, ‘এই জিওব্যাগ লুটপাট মূলত ঠিকাদার এবং ইঞ্জিনিয়ারদের নির্দেশ হয়েছে। তারাই এলাকাবাসীকে বলেছেন এসব জিও ব্যাগ নিয়ে যেতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘লুটপাটের দুই দিনই আমরা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বাধা দিয়েছিলাম। আমরা ঠিকাদারকে প্রশ্ন করেছিলাম আপনারা স্থানীয়দের কেন জিও ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু তখন ঠিকাদার বিষয়টি আমাদের কাছ থেকে এড়িয়ে যান। আনুমানিক ১০০ জনের মতো লোকজন এসব জিও ব্যাগ লুটপাট করে নিয়ে যায়। কেউ চারটা, কেউ পাঁচটা, কেউ ছয়টা করে জিও ব্যাগ নিয়ে গেছেন। ৬ তারিখ রাত ১০ টা থেকে ১২টা এবং ৭ তারিখ সকাল থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত লুটপাট চালায় স্থানীয়রা।’