পবিত্র লাইলাতুল কদর: হাজার মাসের চেয়েও উত্তম রাত

পবিত্র লাইলাতুল কদর বা শবে কদর সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে এটি অত্যন্ত মহিমান্বিত ও পুণ্যময় একটি রাত। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইবাদত-বন্দেগি, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির-আজকারের মধ্য দিয়ে এই রাত অতিবাহিত করেন।

ইসলাম অনুযায়ী, ২০ রমজানের পর যেকোনো বিজোড় রাতে শবে কদর হতে পারে। তবে অনেক আলেমের মতে, ২৬ রমজানের দিবাগত রাতেই শবে কদর আসে। এ উপলক্ষে ২৭ রমজান (১৭ মার্চ, মঙ্গলবার) দেশে সরকারি ছুটি।

ইসলাম অনুযায়ী, এই রাতেই পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। এ রাতকে কেন্দ্র করে পবিত্র কোরআনে ‘আল-কদর’ নামে একটি সুরাও রয়েছে। ‘শবে কদর’ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। শব অর্থ রাত বা রজনী এবং কদর অর্থ সম্মান, মর্যাদা, গুণ, সম্ভাবনা বা ভাগ্য। এর আরবি নাম লাইলাতুল কদর, যার অর্থ সম্মানিত রাত।

রমজানের শেষ দশক এলে মুসলিমদের মনে এক অনন্য উত্তেজনা জেগে ওঠে। কারণ এই দশকেই লুকিয়ে আছে সেই মহিমান্বিত রাত লাইলাতুল কদর, যা আল্লাহর কাছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে বলেছেন : নিশ্চয়ই আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর তুমি কী জানো কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। (সূরা আল-কদর : ১-৩)।

এই রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন, আল্লাহর হুকুমে সবকিছু নির্ধারিত হয় এবং ফজর পর্যন্ত পুরো পরিবেশ শান্তি ও বরকতে ভরে যায়। নবীজি (সা.) এই রাতের সন্ধানে রমজানের শেষ দশ রাতে ইবাদতে অত্যধিক মনোযোগ দিতেন, পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং ইবাদতে এতটাই একাগ্রতা দেখাতেন, যেটা অন্য সময়ে দেখা যেত না। তিনি বলেছেন : যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও প্রতিদানের আশায় লাইলাতুল কদরে রাত জেগে ইবাদত করে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (বুখারি ও মুসলিম)।

এই রাতের সর্বোচ্চ মর্যাদার অন্যতম কারণ হলো— এ রাতেই কুরআন অবতরণের সূচনা হয়েছিল। মানব ইতিহাসের এক মহিমান্বিত মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য পথনির্দেশিকা হিসেবে কোরআন নাজিল করা শুরু করেন। সেই সময় প্রথম যে আয়াত নাজিল হয়েছিল তা ছিল মানুষের চিন্তা ও বিবেককে জাগ্রত করার আহ্বান—‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক: ১) এই আহ্বান ছিল মানুষের দীর্ঘ অজ্ঞানতা ও গাফলতের ঘুম ভাঙানোর আহ্বান। এভাবে পৃথিবীর সঙ্গে আসমানের যোগাযোগ শুরু হয় এবং পরবর্তী তেইশ বছর ধরে তা অব্যাহত থাকে।

এই দীর্ঘ সময় ছিল রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দাওয়াতি জীবনের সময়। এ সময়ের মধ্যে কোরআন মানুষের জন্য সঠিক আকীদা-বিশ্বাস, ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা এবং উন্নত নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান করে। কোরআনের মাধ্যমে মানুষের জীবনে এমন সব নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় যা মানবসমাজে ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাই বলা যায়, লাইলাতুল কদর মানবসভ্যতার এক নতুন যুগের সূচনালগ্ন।