মিজানুর রহমান
‘পঞ্চরত্নের গুণ ও সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হইলাম। সে এক ভয়ংকর সৌন্দর্য। গোবরে পদ্মফুল হইলেও যেন গোলাপের সুরভি ছড়াইয়া দিয়াছে। যেন গৌরবেগাঁথা সাফল্যের মালিকা। রবীন্দ্র, নজরুল কিংবা সুকান্ত নই বলিয়া মনের মাধুরী মিশাইয়া কালি-কলমে, ছত্রে-ছন্দে হূদয়ের অনুভূতিটুকু প্রকাশ করিতে পারিলাম না। ইহা আমার নিজস্ব ব্যর্থতা, যা বড়োই বেদনার কথা’— এসব একজন বিমুগ্ধ বক্তার কথা। কিন্তু এই পঞ্চরত্ন কারা?
বোনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যাহত হবার কষ্ট এবং মায়ের দীক্ষা ও অনুপ্রেরণা থেকে সুবিধাবঞ্চিত নিভৃত পল্লীতে গড়ে ওঠা নারী শিক্ষার এক বিদ্যাপিঠ। যার যাত্রা শুরু হয়েছিল গ্রাম্য বাজারের ছোট্ট একটি পাকাঘরে কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী নিয়ে। মাত্র কয় বছরের ব্যবধানে কলেজটি আজ চারতলা সুরম্য অট্টালিকা। উপজেলার একমাত্র এই গার্লস কলেজটি এলাকার চিত্র পালটে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন বা এগিয়ে যাওয়া চোখে পড়ার মতো। শুরু থেকেই পাশের হার সন্তোষজনক। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য রয়েছে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা। রয়েছে আধুনিক কমনরুম, সমৃদ্ধ পাঠাগার ও বড়ো খেলার মাঠ। মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত প্রত্যেকের জন্য রয়েছে সোনার মেডেলের ব্যবস্থা। শিক্ষকদের সবাই চৌকস। প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র কৃষক ও নিম্ন পেশাজীবীদের সন্তান। মেধা উচ্চমানের না হলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অক্লান্ত পরিশ্রম, অভিভাবক ও পরিচালনা পর্ষদের তদারকি প্রতিবছরই সাফল্য এনে দেয়। এ বছর পাশের হার ৭৬.৫২%। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ জন। এদের মধ্যে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কাঠুরের সন্তানও রয়েছে। কলেজের রেওয়াজ অনুযায়ী এরা প্রত্যেকেই পাবে সোনার মেডেল। এরাই সেই ‘পঞ্চরত্ন’। নরুন্নাহার আক্তার নামের মেয়েটি এই পঞ্চরত্নের একরত্ন। বাবা অতিদরিদ্র কাঠুরে আব্দুস সালাম। পাশের আনন্দ আর অনটনের বেদনায় আবেগাপ্লুত হয়ে পিতা কন্যা দু’জনই কান্নায় ভেঙে পড়েন শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন অনুষ্ঠানে। মেয়ের ভবিষ্যত্ নিয়ে দুর্ভাবনায় পড়েছেন দরিদ্র কাঠুরে বাবা। ধামরাইয়ে নারী শিক্ষার এই অনন্য বিদ্যাপিঠটির নাম রাজাপুর বেগম আনোয়ারা গার্লস কলেজ, যার প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আলীম খান সেলিম। প্রতিষ্ঠানটি ধামরাইয়ের উত্তরাঞ্চল ও মির্জাপুরের দক্ষিণাঞ্চলের মেয়েদের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে।