সত্যের মুখোশে মিথ্যার বেসাতি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতারণা কোনো নূতন বিষয় নহে। বরং যুগে যুগে প্রতারকগণ সময়ের প্রযুক্তিকে আশ্রয় করিয়াই নিজেদের কৌশল পরিশীলিত করিয়াছে। একদা যেইখানে ভুয়া দলিল, মিথ্যা পরিচয় কিংবা গুজবের আশ্রয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হইত, আজ সেই একই কাজ প্রযুক্তির আধুনিকতম অবয়ব-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে-নূতন মাত্রা পাইয়াছে। বিশেষত ফেসবুক, যাহা বাংলাদেশের মানুষের নিকট একপ্রকার দৈনন্দিন বাস্তবতারই সম্প্রসারণ, এখন সত্য ও মিথ্যার সীমারেখাকে বহু ক্ষেত্রেই বিপজ্জনকভাবে অস্পষ্ট করিয়া তুলিতেছে।

বাংলাদেশে ফেসবুকের ব্যবহার কেবল তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নহে; বরং প্রবীণ, প্রযুক্তি-অজ্ঞ কিংবা সীমিত তথ্যপ্রবাহে অভ্যস্ত বৃহৎ জনগোষ্ঠীও ইহাতে সক্রিয়। ইহাদের একটি বড় অংশ ফেসবুকে প্রদর্শিত তথ্যকে প্রায় নিরঙ্কুশভাবে সত্য বলিয়া গ্রহণ করেন। এই সরল বিশ্বাসই প্রতারকদের প্রধান পুঁজি। তাহারা এমন সকল ভুয়া আইডি ও পেজ নির্মাণ করে, যাহা বাহ্যত সত্যের ন্যায় প্রতীয়মান হয়-নাম, ছবি, পরিচয়, এমনকি ভাষাশৈলী পর্যন্ত নিখুঁতভাবে অনুকরণ করা হয়। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে আসল ও নকলের পার্থক্য নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব হইয়া পড়ে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের নাম ব্যবহার করিয়া 'Barrister Kayser Kamal Fan's' নামক ভুয়া ফেসবুক পেইজ ও গ্রুপের মাধ্যমে অপপ্রচারের ঘটনা এই প্রবণতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জাতীয় সংসদ সচিবালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়া স্পষ্ট করিতে হইয়াছে যে, উক্ত পেইজ বা গ্রুপের সহিত ডেপুটি স্পিকারের কোনো প্রকার সংশ্লিষ্টতা নাই। তিনি কেবল তাহার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজ ব্যবহার করেন, অন্য সকল পেইজ প্রতারণামূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এই ধরনের সংকটের মূলত দুইটি দিক রহিয়াছে। প্রথমত, ব্যক্তি-পরিচয়ের অপব্যবহার; দ্বিতীয়ত, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতার অবক্ষয়। যখন কোনো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম ব্যবহার করিয়া ভুয়া প্রচারণা চালানো সম্ভব হয়, তখন তাহা কেবল ব্যক্তিগত সম্মানের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি জনবিশ্বাসকেও ক্ষুণ্ণ করে। আর যখন সাধারণ মানুষ বারংবার বিভ্রান্ত হয়, তখন তাহাদের মধ্যে একটি বিপজ্জনক সংশয় জন্মে-কোনটি সত্য, আর কোনটি মিথ্যা? অপরদিকে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানসমূহও এই সমস্যার গভীরতা উপলব্ধি করিতে শুরু করিয়াছে। মেটা ইতিমধ্যে ভুয়া পরিচয়ে পরিচালিত অ্যাকাউন্ট শনাক্তকরণ এবং নকল কনটেন্ট দমনে নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে। কনটেন্ট নির্মাতাদের সুরক্ষায় অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করা, মৌলিক কনটেন্টের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নিম্নমানের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ-এই সকল পদক্ষেপ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রয়াসমাত্র। তথাপি প্রশ্ন থাকিয়াই যায়-প্রযুক্তিগত সমাধান কি মানবিক সরলতার এই দুর্বলতাকে রোধ করিতে সক্ষম?

বাস্তবতা হইল, প্রযুক্তি যতই উন্নত হউক না কেন, ব্যবহারকারীর সচেতনতা ব্যতীত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নহে। কারণ প্রতারণার মূল লক্ষ্য প্রযুক্তি নহে, মানুষ। অতএব, প্রতিরোধের প্রথম শর্ত হইল-সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা। কোনো তথ্য, যতই বিশ্বাসযোগ্য সূত্র হইতে আসিয়াছে বলিয়া মনে হউক না কেন, তাহা যাচাই না করিয়া গ্রহণ করা বিপজ্জনক। বিশেষত যেই সকল তথ্য আবেগকে উসকাইয়া দেয় কিংবা দ্রুত শেয়ার করিবার আহ্বান জানায়, তাহা অধিকতর সন্দেহের সহিত বিবেচনা করা আবশ্যক।

শেষাবধি, এই বাস্তবতা স্বীকার করিতে হইবে যে, ফেসবুক কেবল একটি মাধ্যম নহে-ইহা এখন সমাজের মানসিক ও বৌদ্ধিক পরিসরের অংশ। অতএব, এই পরিসরে মিথ্যার অবাধ বিচরণ মানে সমাজের অভ্যন্তরে অবিশ্বাসের বিস্তার। যদি আমরা সত্যকে যাচাই করিবার অভ্যাস গড়িয়া তুলিতে না পারি, তাহা হইলে একসময় এমন দিন আসিবে, যখন সত্য নিজেই প্রমাণের জন্য সংগ্রাম করিবে-আর মিথ্যা, কেবল সুন্দর মুখোশ পরিধান করিয়াই মানুষের বিশ্বাসের আসনে আসীন হইবে। সুতরাং প্রত্যেকের নিজ নিজ জায়গা হইতে সর্বাগ্রে সচেতন হইতে হইবে। কারণ, নিজের অসচেতনতায় সবচাইতে বেশি ক্ষতি নিজেরই হয়।