অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সাফিন আদিয়াতের বয়স ১৫ বছর। স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেনের শিক্ষার্থী। এখন সে দোকান থেকে ওষুধ কিনতে পারে, মুদি দোকান থেকে প্রয়োজনীয় পণ্যও নিয়ে আসে। বাবার সঙ্গে রান্নায়ও ভূমিকা রাখে। কম্পিউটার চালানো, গেমস খেলা, ফেসবুকিংও করে। তবে এই প্রতিটি কাজের পেছনে রয়েছে সাফিনের পরিবারের নিবিড় নজরদারি।
সাফিন যখন দোকানে যায়, তখন সেই দোকানদারকে আগে থেকে বলে দেওয়া হয়। বাড়ি থেকে তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়—এত টাকা দেওয়া হলো, এত টাকা ফেরত আসবে। আবার একই সঙ্গে নিরাপত্তার জন্যও তাকে অনুসরণ করা হয়। এই প্রতিটি ধাপে তার অর্ন্তভুক্তিতে সহযোগিতা করে পরিবার। এই সব ধাপ অতিক্রম করে ১৫ বছরে সাফিনকে এই অবস্থায় আনতে পারলেও আমাদের সমাজে বেশিরভাগ অটিস্টিক শিশুর জন্য নেই প্রয়োজনীয় অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সচেতনতা বাড়ায় শহরে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ শিশু শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারছে। তবে প্রান্তিক পর্যায়ে এই সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশের কম। ‘অটিজম কোনো সীমাবদ্ধতা নয়—প্রতিটি জীবন মূল্যবান' প্রতিপাদ্য করে আজ দেশ জুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। দিবসটি উপলক্ষ্যে সরকারের পক্ষে ২০ এপ্রিল বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করার কথা জানানো হয়।
যা বলছে পরিবারগুলো : শাহানা আসিরের তিন ছেলের মধ্যে ২০ বছরের জামি অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। জামি এখন খুবই বেপরোয়া। হঠাৎ আঘাত করে, জিনিসপত্র ভেঙে ফেলে, চিৎকার করে। মা হিসেবে এখন তার বেশ কষ্ট হয়। শাহানার ডাউন সিনড্রোম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন আরেকটি শিশু আছে। তবে সে এত বেপরোয়া নয়। জামিকে নিয়ে চেকআপে যাওয়া খুবই কষ্টকর। কারণ সে বসে থাকতে পারে না। আইনে তাদের যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের দেখার কথা থাকলেও বেশিরভাগ চিকিৎসক তা করেন না। অটিজম বৈশিষ্টসম্পন্নদের মধ্যে যাদের খিঁচুনি আছে, তাদের জন্য বিষয়টি আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়।
মিলি জেসমিনের ছেলে সিয়াম জাহিদ অঙ্কনের বয়স ২৫ বছর। আত্মীয়স্বজনের সামাজিক অনুষ্ঠানে ছেলেকে নিয়ে গেলে মাঝে-মধ্যেই অবাঞ্ছিত হয়ে পড়েন। যখন মিলি থাকবেন না, তখন এই ছেলের কী হবে তাই বলে কেঁদে ফেলেন মিলি। সুইড বাংলাদেশের ভকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে কথা হয় এইমানুল হকের (২২) মা তাহমিনা আক্তারের সঙ্গে। তার দুই হাতের কাপড় তুলে অটিস্টিক ছেলের কামড়ের চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, “ধৈর্য ধরে থাকি, যেন আমার হাত তার গায়ে না ওঠে।' বি-স্ক্যানের নির্বাহী পরিচালক সালমা মাহবুব বলেন, 'গত সরকারের আমলে অটিজম নিয়ে প্রচার- প্রচারণা বেশি হলেও মৌলিক কাজ কম হয়েছে। এখনো অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্নদের জন্য হাসপাতালে বিশেষ একটি চিকিৎসাব্যবস্থা নেই। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ কর্মসংস্থানের সুযোগও তেমন করে হয়নি।
স্কুলগুলোর কর্তৃপক্ষ যা বলে : সুইড বাংলাদেশের ভকেশনাল স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাহমুদা খানম কনা জানান ২০২২ সাল থেকে স্কুলের ১২ জন শিক্ষার্থীকে সুইডের বিভিন্ন বিভাগে কর্মে যুক্ত করা হয়। প্রতিদিন তারা যে কাজ করে, তা চলমান থাকলেও কোনো সমস্যা হয় না। তবে ছেদ পড়লেই ভুলে যায়। এই ঈদ আর রোজার ছুটি তাদের সব ভুলিয়ে দিয়েছে।
নিউরোডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট- এর তথ্য মতে, দেশে ৯৮ হাজার ৫০৩ জন অটিস্টিক ব্যক্তি আছে। তবে এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে ট্রাস্ট থেকে জানানো হয়।
নিউরোডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট (এনডিডি ট্রাস্ট) আইনের বিধিমালায় বলা আছে, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী, আবাসন তৈরি করতে হবে। প্রতিবন্ধকতার ধরন, বয়স- লিঙ্গ অনুযায়ী সুপরিসর কক্ষের ব্যবস্থা, সবার জন্য আলাদা বিছানার ব্যবস্থা, সহজে ব্যবহার করা যায়, এমন বৈদ্যুতিক সুইচ, সেলফ, লকারের ব্যবস্থা, প্রতি দুই জন অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য একজন কেয়ারগিভার নিয়োগসহ নানান বিষয়।
এনডিডি ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক আবু তয়ৈব খান জানান ৯৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮টি বিভাগে এই সব সেবাদান করার জন্য আটটি কেন্দ্র প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে। ঢাকায় দুইটিসহ ১৪টি সেন্টারে অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ, কাউন্সিলিং, সাইকো সোশ্যাল কাউন্সেলিং, জীবন-যাপন বিষয় সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে দক্ষতা ও কর্ম সংস্থান বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই।
তরী ফাউন্ডেশন ও স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেনের পরিচালক মারুফা হোসেন মনে করেন অটিস্টিক ব্যক্তিদের অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাস্তবতা হলো—সবাই সমানভাবে কাজ করতে পারবে না। তাই একটি সমন্বিত ও মানবিক ব্যবস্থা থাকা জরুরি, যেখানে 'কাজ করতে সক্ষম' এবং ‘পূর্ণ সহায়তা প্রয়োজন' দুই ধরনের মানুষই সম্মানজনক জীবন পাবে।
সুইড বাংলাদেশের মহাসচিব মাহবুবুল মুনির বলেন, আইনের বাস্তবায়ন জরুরি। শহরে ও গ্রামে অটিস্টিক ব্যক্তিদের ওপর গবেষণা করে তারা কত সংখ্যক কাজে আছে, কাজে যেতে কী প্রতিবন্ধকতা, প্রতিবন্ধীতার ধরন অনুসারে কাজের সুযোগ করা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে প্রশিক্ষিত করা জরুরি।