হাসপাতালের ৩০ একর জমিই হাতছাড়া!

রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত দেশের প্রাচীনতম সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি নিজেই ‘সংক্রামক ব্যাধিতে’ আক্রান্ত। জানা গেছে, সাততলা ভবনে ১০০ বেডের এই হাসপাতালের নামে ৩৩ একর জমি বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু অবৈধ দখল হতে হতে বর্তমানে মাত্র তিন একর জায়গা হাসপাতালের দখলে রয়েছে। তারপরও দখল বন্ধ হয়নি।

হাসপাতাল অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছে বস্তি, রিকশা গ্যারেজ, হোটেলসহ বিভিন্ন দোকানপাট। পরিবেশও নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। সকাল-সন্ধ্যা ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করে। দিনভর চলে  ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের কেনাবেচা ও সেবন।  এই অবস্থার মধ্যেই সংক্রামক নানা রোগের চিকিত্সা দিচ্ছেন হাসপাতালের চিকিত্সক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

তাদের ভাষ্য, হাসপাতালটিতে দিনের বেলায় মানুষের যাতায়াত থাকায় কিছুটা ভয় কম লাগে। কিন্তু সন্ধ্যার পর জীবন বাজি রেখে রোগী ও চিকিত্সাসেবায় নিয়োজিতদের আসা-যাওয়া করতে হয়। দেশে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি ব্যাপকহারে বাড়ছে। অবিলম্বে হাসপাতালটি কমপক্ষে ৫০০ বেডে উন্নীত করা এবং ক্যাম্পাস দখলমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানীসহ আশপাশের জেলাসমূহের বাসিন্দাদের সেবাপ্রদানকারী হাসপাতালটির বেদখল হওয়া জমি উদ্ধারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অসংখ্যবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো প্রতিকার হয়নি। উলটো হাসপাতালের জায়গা দখলের বিস্তার ঘটেছে। নতুন নতুন একতলা ভবন ও টিনশেডের ঘর তুলে ভাড়া দিয়ে দখলবাজরা কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে।   

এই হাসপাতাল ঘিরে বহু বছর ধরে এই দখল-পালটা দখলবাজি চলে আসছে। আশপাশে বিপুলসংখ্যক বস্তিঘর গড়ে উঠেছে। হাসপাতালটি সাততলা ভবন হওয়ায় ঐ বস্তি এলাকাটি ‘সাততলা বস্তি’ হিসেবে পরিচিত রাজধানীবাসীর কাছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের  জায়গায় গড়ে উঠেছে নতুন নতুন বস্তিঘর, দোকানপাট, কাঁচাবাজার, ফার্নিচার, খাবারের হোটেলসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি দিনরাত চলছে মাদক বেচাকেনা ও সেবন। ইতিপূর্বে এ নিয়ে ইত্তেফাকে কয়েক বার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু অবৈধ দখলমুক্ত করা যায়নি। হাসপাতালের চিকিত্সাসেবারও তেমন কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। প্রশাসন অভিযান চালালে কিছুদিন মাদক বেচাকেনা ও মাস্তানদের তত্পরতা কমে যায়। কয়েক দিন পর আবার একই পরিবেশ হয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য মাদক কারবারিদের কাছ থেকে  নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে থাকেন। দখলবাজদের সঙ্গে হাসপাতাল ও গণপূর্ত বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও জড়িত। তাছাড়া যে দল ক্ষমতায় যায়, সেই দলের একশ্রেণির নেতাকর্মীর নিয়ন্ত্রণে চলে বস্তি ও মাদকের কারবার। এ কারণে কেয়ামত পর্যন্ত এই হাসপাতালটির জায়গা উদ্ধার করা বা মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান। তিনি আরো জানান, বিগত সকল সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই হাসপাতাল এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন। ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দখল অব্যাহত আছে।

হাসপাতালে কর্তব্যরত একাধিক চিকিত্সক জানান, এই হাসপাতালে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ, কুকুর, বানর, বিড়াল, শিয়ালসহ বিভিন্ন হিংস্র প্রাণির কামড়ে আহত, ধনুষ্টঙ্কার, ভাইরাল এলকোফলাইটিস, ডিপথেরিয়া, ভাইরাল হেপাটাইটিস, এইচআইভি পজিটিভ, জন্ডিস, জলবসন্ত, নিউমোনিয়া, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের চিকিত্সা ও টিকা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত হাসপাতালটি পূর্ণ সক্ষমতায় সেবা দিতে পারছে  না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, হাসপাতালটিকে ৫০০ বেডের অত্যাধুনিক হাসপাতালে সম্প্রসারণ করা জরুরি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত কুমার বিশ্বাস বলেন, ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। বিষয়টি মন্ত্রীর নজরে এসেছে বলে তিনি জানান। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সর্দার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, ‘অবৈধ উচ্ছেদসহ আগামী বাজেটে এই হাসপাতালটির চিকিত্সাসেবা সম্প্রসারণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে।’

প্রসঙ্গত, ১৯৬৫ সালে ‘স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন’ নামে এই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭২ সালে হাসপাতালের নামকরণ করা হয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। সম্প্রতি চট্টগ্রামে এরকম আরো একটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছে সরকার।