দেশে হামের প্রাদুর্ভাব, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং স্বাস্থ্য খাতের বাজেট নিয়ে সংসদে রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) সংসদে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ উপস্থাপনকে কেন্দ্র করে এ আলোচনা হয়।
আখতার হোসেন বলেন, দেশে এখন অসংখ্য শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। বিগত তিন সপ্তাহে হামে সন্দেহে মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ১১৫ ছাড়িয়েছে এবং সারাদেশে হাজার হাজার শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন গত আট বছর হামের টিকা দেওয়া হয়নি। তবে মাঠপর্যায়ে যারা টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তাদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। যদি সত্যিই ২০২৪ সালের আগে বা পরবর্তী সময়ে টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি থেকে থাকে, তাহলে জিরো ডোজ শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা হলো না কেন সেটি বড় প্রশ্ন।
আখতার হোসেন আরও বলেন, ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য কোনো বিশেষ টিকাদান অভিযান পরিচালনা না হওয়া বিস্ময়কর। আগে থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ার ফলেই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতার দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য আইসোলেশন ব্যবস্থার প্রয়োজন হলেও উপজেলা, জেলা, এমনকি বড় হাসপাতালগুলোতেও এ সুবিধা নেই। বিশেষ করে রাজশাহীতে পর্যাপ্ত আইসিইউ ও নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের সংকট রয়েছে।
এ ছাড়া বর্তমানে ৬ মাস বা তারও কম বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে উল্লেখ করে এনসিপির এই এমপি বলেন, সরকারের রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা আগে থেকে কেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারলেন না, সেই ব্যর্থতার কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, অতীত সরকারের ভুল ব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতার কারণেই বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশে সর্বশেষ হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর কোনো ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়নি। প্রতি চার বছর পরপর এ কর্মসূচি হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। ফলে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, টিকা ক্রয়, সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিগত দুই সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে টিকার মারাত্মক সংকট তৈরি হয়। এর ফলে হামের টিকাসহ আরও ছয় ধরনের টিকার অভাব দেখা দেয় এবং বহু শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি এগিয়ে আনা হয়েছে। গত ৫ এপ্রিল থেকে হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে দেশের ১৮টি জেলা ও ৩০টি উপজেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এ ধাপে ১২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে সারাদেশে টিকার ব্যবস্থা করা হবে। আগামী ৩ মে থেকে দেশের সব সিটি করপোরেশন ও জেলাগুলোতে টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
সরকার শুধু টিকাদান নয়, এর পাশাপাশি হামে আক্রান্ত এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে দেশের প্রতিটি জেলায় ৬ মাস থেকে ১ বছর বয়সী শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল বিতরণ করা হচ্ছে, যা আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় এবং সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
আক্রান্ত শিশুদের জন্য দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজশাহী হাসপাতালে আরও ২৫০টি আইসোলেশন বেডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভেন্টিলেটরসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
মন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আখতার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, মন্ত্রী যেভাবে আইসোলেশন ও আইসিইউর কথা বলেছেন, মাঠের পরিস্থিতি তা নয়।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পত্রিকায় আমরা দেখছি রোগীরা আইসোলেশন ও আইসিইউ পাচ্ছে না। সরকারের তরফে বরাদ্দ থাকলেও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকলে সরকারকে তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানাই।
এ ছাড়া আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ অনুযায়ী ব্যয় হয় না। দেশের মোট বাজেটের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হয়, যা জিডিপির ১ শতাংশেরও কম। ফলে জনগণকে বেশিরভাগ চিকিৎসা ব্যয় নিজেকেই বহন করতে হয়।
আসন্ন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পাবে কি না এ প্রশ্নও তোলেন তিনি। এর জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কিছু ক্ষেত্রে ভালো কাজ আদায়ে মিডিয়া সরকারকে চাপে রাখে। তবে কোনো হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডের ঘাটতি নেই বলেও তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে আইসিইউ ইউনিট দ্রুত সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বাড়ানোর বিষয়ে আশ্বস্ত করেন মন্ত্রী।