ঢাকায় ভারতের পরবর্তী হাইকমিশনার কে হচ্ছেন, আলোচনায় আরিফ খানের নাম

ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিহারের সদ্য সাবেক রাজ্যপাল আরিফ মোহাম্মদ খানের নাম ভাসছে আলোচনায়। এই ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। এমনকি বিশ্বেও এমন দৃষ্টান্ত একেবারেই নগণ্য। 

জানা যায়, পেশাদার কূটনীতিক না হলেও তাকেই প্রতিনিধি হিসেবে ভারত সরকার প্রতিবেশী বাংলাদেশের জন্য বেছে নিতে পারে বলে আভাস মেলার কথা কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বলছে।

ঢাকায় ভারতের বর্তমান হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মাকে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে পাঠানো হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির পরে সেখানকার দায়িত্ব ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রণয় ভার্মা সেই দায়িত্ব পেলে তার উত্তরসূরি কে হবেন তা নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস নিউ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কেবল পেশাদার কূটনীতিকদেরই রাষ্ট্রদূত বা হাই কমিশনার করতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা ভারতে নেই। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক বা কর্মকর্তাদেরও দূত হিসেবে পাঠিয়েছে ভারত।

সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ঢাকায় পরবর্তী হাই কমিশনার একজন পেশাদার কূটনীতিক হবেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। প্রণয়ের উত্তরসূরি হিসেবে বিহারের সাবেক রাজ্যপাল আরিফ মোহাম্মদ খানের নাম আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি একজন বাংলা ভাষাভাষী দূতের কথাও শোনা যাচ্ছে, যিনি বাংলাদেশের ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত। এ কারণে ঢাকায় হাই কমিশনার হিসেবে রাজনৈতিক ব্যক্তির দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভারতের সিভিল সার্ভিস ও প্রশাসন বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ানমান্দারিনস ডটকমও লিখেছে, আরিফ মোহাম্মদ খানকে বাংলাদেশে পরবর্তী হাই কমিশনারের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

গত বছর থেকে বিহার রাজ্যে রাজ্যপালের দায়িত্ব সামলে আসা আরিফ মোহাম্মদ খানকে সম্প্রতি দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে। এরপরই তিনি বাংলাদেশে হাই কমিশনারের দায়িত্ব পাচ্ছেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

ভারতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ এক খেলোয়াড় আরিফ মোহাম্মদ খান। রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ছাত্র থাকার সময়ে। কংগ্রেসসহ একাধিক সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। সবশেষ যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। 

১৯৮৬ সালে সংসদে ‘মুসলিম মহিলা (বিবাহবিচ্ছেদে অধিকার সুরক্ষা) বিল’ আনার ঘোষণা দেয় সরকার। এর বিরোধিতা করেন আরিফ মোহাম্মদ খান। ক্ষোভ ও হতাশায় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে পরে বিলটি পাসও করে নেয় কংগ্রেস। ইতিহাসে এই ঘটনাই পরিচিত হয়ে যায় “শাহ বানু রায়কে উল্টে দেওয়া” হিসেবে। কার্যত, সুপ্রিম কোর্টের মানবিক ও প্রগতিশীল রায় অকার্যকর হয়ে যায় সংসদের এক ভোটে।

পরে কংগ্রেস ত্যাগ করে অন্যদলে যোগ দেন আরিফ খান। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে ব্যাপক ভরাডুবি ঘটে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের। এই ভরাডুবির পেছনে আরিফ মোহাম্মদ খানের কংগ্রেস ত্যাগকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়। কারণ, শাহ বানুর মামলার রায় ঘোষণার কয়েকমাসের মধ্যেই ঘোলাটে হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পরিবেশ। রাজীব গান্ধীর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড ও রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতারা। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে কয়েকটি উপনির্বাচন হয়। সেখানে ভরাডুবি ঘটে কংগ্রেস প্রার্থীদের। ভয় পেয়ে যান রাজীব গান্ধী। মুসলিম ভোট ব্যাংক হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা পেয়ে বসে তাকে। 

এরপরই আরিফ খান মন্ত্রিসভা ও কংগ্রেস ত্যাগ করেন। কিন্তু তার পথচলা থেমে যায়নি। একাধিকবার মন্ত্রী হয়েছেন। শেষে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। সর্বশেষ বিহারের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

সেই আরিফ খানকেই এবার ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে হাইকমিশনার করে। এর আগে, ভারত সরকার এত বড় প্রোফাইলের কাউকে কখনো রাষ্ট্রদূত করেছে কি না, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চলছে। আর বাংলাদেশেই কেন এত বড় ঝানু রাজনীতিককে পাঠানো হচ্ছে? 

আরিফ খান বাংলাদেশে হাইকমিশনার হয়ে এলে তার পদমর্যাদা কী হবে? তাকে হয়ত পাঠানো হবে ভারতের কেন্দ্রীয় পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এর কম দেওয়াটা তার ক্ষেত্রে মানায় না। তার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদকে কেন বাংলাদেশে হাইকমিশনার করে পাঠানো হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে বাংলাদেশ ও ভারতে।