সবুজের মায়ায় মোড়ানো রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে উচ্চশিক্ষার বাতিঘর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নগরজীবনের ব্যস্ততা, যানজট আর কোলাহলের মধ্যেও এখানে লুকিয়ে আছে এক অনন্য প্রশান্তি। প্রাচীন বট, অশ্বত্থ, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া ও নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি যেন সবুজের বিশাল এক চাদর বিছিয়ে রেখেছে পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে। পাখির কিচিরমিচিরে মুখর সকাল, প্রাণজুড়ানো দক্ষিণা বাতাস আর প্রকৃতির কোমল স্নিগ্ধতায় মোড়ানো এই প্রাঙ্গণ জ্ঞান ও সৌন্দর্যের এক অপূর্ব মিলনস্থল হয়ে উঠেছে।
বসন্তের শেষভাগের তাপদাহে দেশের মানুষ হাঁসফাঁস করছে, ঠিক তখনই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফুটে ওঠা বাহারি ফুলগুলো যেন শিক্ষার্থীদের মন ও মনন শীতল করার এক নীরব আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয়। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে রঙিন ফুলের সমারোহে সেজে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। চেরি ফুলের মতো দেখতে কুরচি ফুল ফুটে আছে থরে থরে। মনে হয়, প্রকৃতির মুখে কেউ রঙিন আবির ছড়িয়ে দিয়েছে নিঃশব্দে। রাধাচূড়া, সোনালু, জারুল, বকুল, কনকচূড়া, বাগানবিলাসী, কাঠগোলাপ, অপরাজিতা, রঙ্গন, সূর্যমুখীসহ এমন অসংখ্য চেনা-অচেনা ফুলের উপস্থিতিতে ক্যাম্পাসে সৃষ্টি হয়েছে এক বৈচিত্র্যময় নান্দনিক পরিবেশ। এই সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার নয়, অনুভব করারও। ফুলের সুবাস আর রঙের মায়া একসঙ্গে মিলে ক্যাম্পাস জুড়ে তৈরি করে এক অন্যরকম আবেশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ ছুটে আসে। কেউ ছবি তোলে, কেউ স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতে চায় এক টুকরো প্রশান্তি। মলচত্বর, ফুলার রোড, কলাভবন, কেন্দ্রীয় মসজিদ, চারুকলা অনুষদ, বিভিন্ন আবাসিক হল, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ, আইন অনুষদ, কার্জন হলসহ ক্যাম্পাসের প্রতিটি সড়কের দুই পাশের গাছপালা নিজ নিজ সৌন্দর্যে সেজে উঠেছে। ডালপালার বিস্তারে তারা যেন নীরবে ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রকৃতির মুগ্ধতা। ভিসি চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো কড়ই, (রেইনট্রি) গাছটি যেন সময়ের নীরব সাক্ষী। স্মৃতি চিরন্তনের পাশে তার স্নিগ্ধ ছায়া ক্যাম্পাসের অন্যতম প্রশান্তির আশ্রয়। এই ছায়াতেই সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে লাল বাসগুলো।
কার্জন হল এলাকায় রয়েছে উদ্ভিদবিজ্ঞান উদ্যান ও ভেষজ উদ্যান, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধীনে পরিচালিত। ভেষজ উদ্যানে দেশি-বিদেশি নানা ভেষজ উদ্ভিদের সমাহার দেখা যায়। অন্যদিকে, উদ্ভিদবিজ্ঞান উদ্যানেও রয়েছে সমৃদ্ধ গাছপালার সংগ্রহ, যা গবেষণা ও শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরি কালচার সেন্টারের তথ্যমতে, এই ক্যাম্পাসে রয়েছে বিপুল বৈচিত্র্যের বৃক্ষ ও ফুলগাছ। শিমুল, ধুজা, ঝাউ, নাগচম্পা, বিভিন্ন প্রজাতির পাম (রয়্যাল পাম, এরেকা পাম, র্যাপিস পাম), বোতলব্রাশ, কামিনী, কাঞ্চন, সুষমা, পাইনাস, ক্যাকটাস, নাগলিঙ্গম, ক্যানন শেল ট্রি, প্লামবাগো, গ্লিরিসিডিয়া, ম্যাগনোলিয়া, হিজল, হিমচাঁপা, স্বর্ণচাঁপা, কনকচাঁপা, সিলভার ওক, কোলিয়াস, হলুদ ঘণ্টা, রক্তকরবী, জ্যাকারেন্ডা, অরোকেরিয়া, অশোক, নীলমণি লতা, মাধবীলতা, জুঁই, মধুমঞ্জুরি, মর্নিং গ্লোরি, ভারননিয়া, ব্লিডিং হার্ট, রক্তরাগ, মহুয়া, ইউফোরবিয়াসহ অসংখ্য উদ্ভিদ এই ক্যাম্পাসকে করে তুলেছে জীববৈচিত্র্যের এক সমৃদ্ধ ভান্ডার।
বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্ব জুড়ে অপরিকল্পিত বৃক্ষনিধনের কারণে সবুজের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার সবুজ ঐতিহ্যের বড় একটি অংশ এখনো ধরে রাখতে পেরেছে। ইতিহাসের প্রতিটি ক্রান্তিকালে যেমন এই বিশ্ববিদ্যালয় পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছে, তেমনি পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজায়নের ক্ষেত্রেও এটি হতে পারে অনুকরণীয় এক দৃষ্টান্ত।